হয়ে গেলাম (আমরা) ‘আত্মঘাতী কলহপ্রবণ বাঙালি’ !!! – পীযূষ সরকার

হয়ে গেলাম (আমরা) ‘আত্মঘাতী কলহপ্রবণ বাঙালি’ !!!

লেখক: পীযূষ সরকার

হয়ে গেলাম (আমরা) ‘আত্মঘাতী কলহপ্রবণ বাঙালি’ !!! ; আমার আমারলার বাদে এইবার হিন্দিই বরাদ্দ ! দুই ভাষাবিদ, Ethnologist,শিকড় সন্ধানী শ্রদ্ধেয় মানুষ প্রকারান্তরে ‘কী কবার চাইলেন , ভিতিরা ঢুকি বুঝি নেও !’ আর বৃহত্তর রাজবংশী জনজাতির সাথে অন্যান্য ভাষাভাষী ‘আদি’বাসী জনগোষ্ঠী চিনি রাখুন এনাদের । আমি ‘রাজবংশী’ মি. সেনগুপ্ত এবং দাশ , ভাষা রাজবংশী । হিন্দির বাড়বাড়ন্তে আমার আমাদের হাত নেই একদম । কারণ বাংলা ভাষাকে আমি ভালোবাসি , শ্রদ্ধা করি বলিও বাড়ির বাইরে ,প্রয়জনে ও বন্ধু মহলে এবং ভালো বলি । ভাটিয়ালি বলি ,টাঙ্গাইল (accent) পারি , ইংরেজী পারি অল্প , অহমিয়া পারি ,নেপালী, সাদরি,মেচ(অল্প) ,হিন্দিও ! ভালোবেসে শিখেছি এইসব ভাষার কিছু কিছু উচ্চারণ ভঙ্গিকে শ্রদ্ধা করেই । বলি সব ভাষা , লিখিও কয়েকটা । কিন্তু আমার মাতৃভাষা ‘রাজবংশী’ ! আপনি সহ অনেকের যেমন মনে হয় ‘হিন্দি’ বাংলার উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে ; এখানকার অনেক অন্য ভাষাভাষীর জনজাতি একইভাবে মনে করতে বাধ্য হন যে তাঁদের উপর ‘বাংলা’ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে ! তার বেলা ????? যে শিশুটি বাড়িতে স্বতস্ফূর্ত ভাবে বলে -“মায় থাঙায় নিঙি?” তাকে প্রাইমারি স্কুলে গিয়ে শিখতে হচ্ছে ‘থুমি কুথায় যাও?” , যে বোনটি বাড়িতে বলছে -” মো ভলি রাসমেলা মা যাঞ্ছু” , তাঁকে রচনায় লিখতে হচ্ছে “আমি রাসমেলায় যাবো ” ; যে ভাইটি বাড়িতে বলছে – ” মোক ভোক নাইগচে” , তাকে বিদ্যালয়ে “আমার খিদে পেয়েছে ” না বল্লে পিট্টি অথবা মস্করা অব্দি জুটছে ! এগুলো চাপানো নয় ? কষ্টের কাহিনী নয় ? খিল্লি করেন Kiriti Sengupta ? আত্মঘাতী কলহপ্রবণ বাঙালি আপনারা …যাঁরা সব জাতির ,ভাষার,কৃষ্টির মানুষকে বলেন আমার টা গ্রহণ করুন , নিজের টা ত্যাগ করুন । এটা “বাংলা” এখানে সবাই বাংলা বলবে , সবাই বাঙালি ! মিশ্র ভাষা , মিশ্র সংস্কৃতিতে, শুধু ‘বাংলা’ বলে চিৎকার করলে বাকিরা চুপ থাকবেই । এই চাপিয়ে দেওয়ার রাজনীতি করতে গিয়েই বাঙালি আজ কোনঠাসা , আরও হবে হয়তো ! অথচ অন্য ভাষাভাষী মানুষেরা তেমন ‘বাংলা বিরোধিতা’ করছেন না , ‘আমরা বাঙালি’ র মতো ‘আমরা রাজবংশী’ ‘আমরা সাঁওতালি’ ‘আমরা বোড়ো’ ‘আমরা রাভা’ সর্বোপরি আমরা কোচ এরকম মিছিল বেরোচ্ছে না ,মিটিং হচ্ছে না । আপনাদের সুক্ষ্ম অথচ তীক্ষ্ণ আক্রমণের ফলেই এটা কোথাও কোথাও হচ্ছে । হিন্দির সাথে ‘রাজবংশী’র কোনো আত্মিক সম্পর্ক নেই দুঃসম্পর্কও নেই ; কিন্তু হিন্দির জন্য আপনাদের যে কষ্টটা হচ্ছে, অনেক মানুষ বাংলা চাপিয়ে দেওয়ায় একই কষ্ট পান ,পাচ্ছেন । হাজার হোক মাতৃভাষা তো দেবাশিস বাবু, kiriti sengupta ! আপনি বলবেন ,আমি কে ভাষার স্বীকৃতি দেবার ? কেউ নন ! আপনি খিল্লি করার , হাহা রিয়াক্ট দেওয়ারও কেউ নন ,স্যার ।

একটি বৃহত্তর জনজাতি ,যার নিজস্ব ভাষা ,সাহিত্য,ইতিহাস,ঐতিহ্য,গান, নাচ, শ্লোক, পুঁথি, লিপি, পুরান, চেহারায় স্বকীয় মোঙ্গলয়েড ছাপ, হাটাচলা ,বাচনভঙ্গি নিজস্ব ও indigenous ….সেই ethnic জনগোষ্ঠী কে আপনি চাইলেই “আত্মঘাতী কলহপ্রবণ বাঙালি” বলে দিতে পারেন না । আমরা অনেকেই বাঙালি নই আবার বাঙালি বিরোধীও নই ; আপনাদের grammatical knowledge ভালো, ফিল্ড ওয়ার্ক কম । মাটির কাছের আদি ও স্বকীয় ইতিহাস ,মানুষ, পরিচয় কে আপনারা স্বীকার করতে ভয় পান বা চালাকি করে চাপা দিতে চান।

আপনাদের মতো মানসিকতার জন্যই হয়তো আজও কামতেশ্বরের ইতিহাস মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে ! আপনাদের শ্রদ্ধার ভনিতা আমাদের দেখাবেন না ।শুদ্ধ ‘বাঙালি’ সেদিন হবেন যেদিন রাজবংশী কে রাজবংশী হিসেবে , সাঁওতালি কে সাঁওতালি হিসেবে , টোটো কে টো হিসেবে শ্রদ্ধা জানিয়ে ,তাদের স্বকীয়তা কে শ্রদ্ধা জানিয়ে বলুন – “ভাই, চলো মিছিল করি “। হবে মিছিল , কথা দিলাম হবে । আমাদের এখনও সেই indigenous unity আছে । দল বাঁধার সাহস ও বীরত্ব আছে।

কিন্তু সবাইকে বাঙালি বলে ,সব ভাষাকে বাংলা বা বাংলার উপভাষা বলে লেজেগোবরে করে কোনদিন হিন্দির বিরোধিতা সার্থক হবে না । কারণ আপনরা ‘এক’ করতে গিয়ে অন্য কোথাও স্পর্শকাতর কিছু ভেঙে ফেলছেন, বহু করে দিচ্ছেন। মাননীয় সেনগুপ্ত আপনার সদাহাস্যমুখ একটু গম্ভীর করে সবার ঐতিহাসিক ও আদি পরিচয় নিয়ে পড়াশুনা করুন, ভাবুন। ‘আমি’ থেকে আমরা হোন !

N.B – সৎ বাঙালি দাদা, ভাই, বোন, কাকু, জেঠুরাও চিনে রাখুন এইসব ‘বাঙালি’ কে যাঁরা বাংলার ভালো করতে গিয়ে ‘মন্দ’ গেয়ে বেরান। সবাইকে আঘাত করা আমার উদ্দেশ্য নয় বরং ঘরে বাইরে আমার বহু বাঙালি বন্ধু ও স্বজন আছেন যাঁরা সম্মান করা বোঝেন ও করেন, আমিও করি 😊

আরো পড়ুন –

👉কোচ রাজবংশী কামতাপুরী ছাওয়ালার বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগত পরিচয় ও পঃবঃ সরকারের দায়বদ্ধতা।

Share this:

Leave a comment