পঞ্চানন বর্ম্মা সহযােগী হেদেল্লা বর্ম্মা এবং মাথাভাঙ্গা পরগনার নায়েব আহিলকার আশুতোষ ঘােষ

এই ঘটনাটি কেন তৎকালীন নায়েব আহিলকার আশুতােষ ঘােষ ঘটাইলেন? শ্রীযুক্ত হেদেল্লা বর্ম্মার প্রতি তাঁর কিসের রােষ? তিনি কেন এই অপকর্মটি করাইলেন একটি পরগনার প্রশাসনিক প্রধান হয়েও? ইতিহাস সত্যনিষ্ঠ। নির্মম। ইতিহাসের ধর্মই এই। সে একদিন না একদিন মাথা উচিয়ে বিবেকের বিশ্বমন্চে প্রকাশ করে নির্মম সত্যকে। সেই সময়ের ঘটনাক্রমকে আমরা জানতে চেষ্টা করব। কি সেই কারণ এবং কোন রহস্য আছে এই ঘটনাক্রমের পেছনে?

১৩১৯ সনের ৫ই চৈত্র মাথাভাঙ্গায় মিলনক্ষেত্র। ৭ই চৈত্র মাথাভাঙ্গার নিকটে একজন উচ্চপদস্থ রাজপুরুষ(?) একটি ক্ষত্রিয় চৌকিদারকে হীন কাজ করিতে বলিলেন। চৌকিদার সেই হীনকাজ করিতে অস্বীকার করিলেন। বরং তিনি রুজিরুটির সেই চাকরি ত্যাগ করাই শ্রেয় বলে বিবেচনা করিলেন। এবং চাকুরি ত্যাগ করিতে চাহিলেন।

ক্ষত্রিয় সমিতির তৃতীয় বর্ষের বৃত্তবিবরণী ও চতুর্থ বর্ষের অধিবেশন থেকে কিছু আলােচনা এখানে লিপিবদ্ধ করছি।

“সংবাদ পাইয়া সম্পাদক মাথাভাঙ্গা মহকুমায় গেলে তথাকার নায়েব আহিলকার অর্থাৎ সাবডিভিশন অফিসার শ্রীযুক্ত আশুতােষ ঘােষ মহাশয় দেওয়ানের পত্র বলিয়া একখানি পত্র পড়িয়া শুনাইয়া সম্পাদককে বলিলেন, দেওয়ান মহাশয় চটিয়াছেন; মিলনক্ষেত্রগুলির সমস্ত টাকা সরকারে দিতে হইবে; যে সকল মিলনক্ষেত্রের টাকা রংপুরে গিয়াছে, তাহাও ফেরৎ দিতে হইবে; রাজ্যমধ্যে আর মিলনক্ষেত্র হইতে পারিবে না; ক্ষত্রিয় সমাজের নেতাগণকে ফৌজদারীতে ফেলিয়া ফাটক দেওয়া হইবে; রাজ্য হইতে বিতাড়িত করিয়া দেওয়া হইবে; এবং তাহাদের জমি জমা সমস্ত খাস করিয়া লওয়া হইবে।

সম্পাদক উত্তর করিলেন – মিলনক্ষেত্রের সংসদগণের নিকট যে টাকা আছে, তাহা তাহাদের নিকট সমিতির ধনভাণ্ডারের জন্য প্রদত্ত, গচ্ছিত টাকা; উহা তাহাদের নহে। ঐ টাকা সরকারে দিতে তাহাদের কোন অধিকার নাই। উহা দিলে, তাহারা বিশ্বাসঘাতকতা বা তহবিল তছরূপ অপরাধে অপরাধী হইবেন; এবং যে রাজপুরুষগণ মিলনসংসদের নিকট হইতে ঐ টাকা লওয়ার জন্য জুলুম করিতেছেন, তাহারা নিজেরাও তহবিল তছরূপ অপরাধের সহায়তা অপরাধে অপরাধী হইবেন। আর সমিতির ধনভাণ্ডারে প্রেরিত টাকা সম্পাদকের নিজস্ব নহে; সমিতির টাকা। দেওয়ান বাহাদুর যদি নিতান্তই ঐ টাকা চান, ক্ষত্রিয় সমিতির সম্পাদকের বরাবর চিঠী লিখিতে পারেন; চিঠী পাইলে সমিতি নিজ কর্তব্য অবধারণ করিবেন।

অতঃপর অত্যাচার বাড়িতে লাগিল। মিলন সংসদ্গণের নিকট টাকা চাওয়া আরম্ভ আগেই হইয়াছিল। এখন কোন কোন মিলন সংসদের বাড়ী হাকিম স্বয়ং যাইতে লাগিলেন। কোন কোন মিলনসংসদের সদস্যগণকে পিয়ণদ্বারা বা পরওয়ানাদ্বারা, এবং স্থল বিশেষে ওয়ারেন্ট করিয়া পুলিশ দ্বারা ধরিয়া, আনা হইতে লাগিল। সম্মুখে উপস্থিত মিলনসদস্যগণের উপর, এজলাশে উপবিষ্ট নায়েব আহেলকার মহাশয়ের তর্জ্জন গর্জ্জনের এবং ফৌজদারীতে দিয়া ফাটক দিতে, জমি জায়গা খাস করিয়া লইতে, রাজ্য হইতে বিতাড়িত করিয়া দিতে, ভয় প্রদর্শনের সীমা রহিল না। যাহারা মিলনক্ষেত্রের টাকা পুর্বেই ধনভাণ্ডারে পাঠাইয়াছেন, তাহাদেরও নিস্কৃতি নাই। টাকা ফিরাইয়া আনিয়া ট্রেজারীতে দাখিল করিতে জুনুম করা হইতে লাগিল। এইরুপ তর্জ্জন গর্জ্জন ও ভয় প্রদর্শন প্রতিদিন চলিতে লাগিল। স্থল বিশেষে পুলিস দ্বারাও ভয় দেখানাে হইতে লাগিল। উপবীতী ক্ষত্রিয়গণের জায়গীর ও দেবত্তর-জমি খাস করিয়া লওয়ার পরওয়ানা জারী হইল। এবং শুনা গেল সম্পাদকের সম্পত্তি খাস করিয়া লইয়া, তাহাকে রাজ্য হইতে বিতাড়িত করিয়া দেওয়ার নিমিত্ত মাথাভাঙ্গার নায়েব-আহেলকার বাবু দেওয়ান বাহাদুরের বরাবর রিপাের্ট করিলেন। কিন্তু মিলনসংসদ ও দ্রষ্টারা সকলে অটল; দিনের পর দিন নানারূপ তিরস্কৃত ও লাঞ্চিত হইতে লাগিল; কিন্তু তাহাদের উত্তর এক ঃ- টাকা প্রায়শ্চিত্তের টাকা-সমাজের দান-ক্ষত্রিয় সমিতির ধনভাণ্ডারে দেওয়ার জন্য তাহাদের নিকট গচ্ছিত আছে; টাকা তাহাদের নহে; অন্য কাহাকেও সেই টাকা দিবার অধিকার তাহাদের নাই; দেওয়ান বাহাদুর যদি ঐ টাকা চান, তবে ঐ টাকা তাহারা সম্মুখেই ধরিয়া আছেন, কাড়িয়া লইয়া যাইতে পারেন। কুচবিহারবাসী হউক বা রংপুরবাসী হউক বা অন্য অঞ্চলের নিবাসী হউক,ক্ষত্রিয়গণের সমাজ এক; ক্ষত্রিয় সমিতি সেই সমাজের কেন্দ্র; ক্ষত্রিয় সমিতির ধনভান্ডারই সমাজের ধনভাণ্ডার-রক্তভাণ্ড, হৃদয়।

উপরিউক্ত আলােচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা অন্ততঃ এটা ধারণা করতেই পারি যে, উচ্চপদস্থ রাজপুরুষ (?) যিনি চৌকিদারকে হীন কাজ করিতে বলিয়াছেন তিনি কে? যদি সেই রাজপুরুষ নায়েব আহিলকার আশুতােষ ঘােষ হয় তবে তিনি যাকে হীন কাজ করিতে বলিয়াছেন তিনি হীন হন নি। হীন হইয়াছেন স্বয়ং নায়েব আহিলকার আশুতােষ ঘােষ।

এবং ক্ষত্রিয় সমিতির বৃত্তবিবরণী পাঠে আমরা অবগত হই যে তৎকালীন নায়েব আহিলকার আশুতােষ ঘােষ মাথাভাঙ্গার ক্ষত্রিয় সমাজের উপর যতটা সম্ভব তিনি অন্যায় ও অত্যাচার করিয়াছেন এবং প্রশাসনিক পদকে কলুষিত করিয়াছেন। অবশ্য এও জানা যাচ্ছে যে তৎকালীন দেওয়ান বাহাদুর শ্রীযুক্ত প্রিয়নাথ ঘােষ কুচবিহারের ডােডেয়ার হাট গিয়া পৈতা লইতে বারণ করিয়াছেন। এ সংবাদ আমরা পাই, বানেশ্বর ধামের নিকটবর্তী গ্রামনিবাসী শ্রীযুক্ত হরকান্ত অধিকারী মহাশয়ের লিখিত একখানি পত্রে (তৃতীয়বর্ষের বৃত্তবিবরণী)। যদি আমরা ধরেই নিই যে দেওয়ান বাহাদুর এরকম পত্র লিখিয়াছেন বা নির্দেশ দিয়াছেন এবং আশুতােষ ঘােষ নায়েব আহিলকার তাঁর দায়িত্ব পালন করিয়াছেন মাত্র। তবুও প্রশ্ন আসে যে, দেওয়ান কি এরকম পত্র লিখিতে পারেন? বা এরকম আদেশ করিতে পারেন? নায়েব আহিলকার মহাশয় বলিয়াছেন, ‘দেওয়ান বাহাদুর চটিয়াছেন’, কিন্তু তিনি সেই পত্র কিন্তু ক্ষত্রিয় সমিতির সম্পাদক মহাশয়ের হস্তে প্রদর্শিত করেন নি বা দেওয়ান বাহাদুরও কিন্তু ক্ষত্রিয় সমিতিতে কোনরূপ পত্র বা নির্দেশ দিয়াছেন বলে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না বা জানা যাচ্ছে না। তাছাড়াও দেখা যাচ্ছে যে নায়েব আহিলকার মহাশয় স্বউদ্যোগে ফৌজদারী কার্য বিধির ১০৯ ও ১১০ ধারা জারি করাইয়াছেন। যে ধারার সঙ্গে হেদেলা বর্ম্মার কোন যােগ নেই। সেই দুষ্কার্য্যকারী ব্যক্তিটি আত্মহত্যা করিয়াছেন পুলিস তদন্ত করিয়া রিপাের্ট দিয়াছেন। তবুও ১০৯ ও ১১০ ফৌজদারী ধারাতে কেস করাইয়া নােটিশ জারি করাইয়াছেন। চোরের মাল রাখা, চোরের থাপাইত হওয়া ও অসৎ উপায়ে জীবীকা অর্জন করার কোন ঘটনার সাথে শ্রীযুক্ত হেদেল্লা বর্ম্মা ও ক্ষত্রিয় সমিতির প্রচারক শ্রীযুক্ত ক্ষীরনারায়ণ বর্ম্মার কি যােগাযােগ? তবে কি তিনি ক্ষত্রিয় সমিতি ও ক্ষত্রিয় সমিতির সঙ্গে যুক্ত মানুষজনকে বিভিন্ন ভাবে হয়রানি করার জন্যই এই কাজ করিয়াছেন? ঘটনাক্রম কিন্তু সেদিকেই ঈঙ্গিত করে। বৃত্তবিবরণীতে যা উল্লেখ আছে তা কিন্তু মারাত্মক ঈঙ্গিত বহন করে। তিনি বলিয়াছেন, “মিলনক্ষেত্রগুলির সমস্ত টাকা সরকারে দিতে হইবে; যে সকল মিলনক্ষেত্রের টাকা রংপুরে গিয়াছে, তাহাও ফেরৎ দিতে হইবে; রাজ্যমধ্যে আর মিলনক্ষেত্র হইতে পারিবে না; ক্ষত্রিয় সমাজের নেতাগণকে ফৌজদারীতে ফেলিয়া ফাটক দেওয়া হইবে; রাজ্য হইতে বিতাড়িত করিয়া দেওয়া হইবে; এবং তাহাদের জমি জমা সমস্ত খাস করিয়া লওয়া হইবে।

পরিশেষে উল্লেখ করার মত বিষয় যে, ক্ষত্রিয় সমিতির প্রাণ পুরুষ সেদিন কিন্তু যথাযথ প্রত্যুত্তর দিয়েছেন নায়েব আহিলকার আশুতােষ ঘােষ মহাশয়কে। পঞ্চানন বর্ম্মা বলিয়াছেন, “মিলনক্ষেত্রের সংসদ্গণের নিকট যে টাকা আছে, তাহা তাহাদের নিকট সমিতির ধনভাণ্ডারের জন্য প্রদত্ত, গচ্ছিত টাকা; উহা তাহাদের নহে। ঐ টাকা সরকারে দিতে তাহাদের কোন অধিকার নাই। উহা দিলে, তাহারা বিশ্বাসঘাতকতা বা তহবিলতছরূপ অপরাধে অপরাধী হইবেন; এবং যে রাজপুরুষগণ মিলনসংসদের নিকট হইতে ঐ টাকা লওয়ার জন্য জুলুম করিতেছেন, তাহারা নিজেরাও তহবিল তছরূপ অপরাধের সহায়তা অপরাধে অপরাধী হইবেন।” এবং তিনি জোরের সহিত বলিয়াছেন যে, সমিতির ধনভাণ্ডারে প্রেরিত টাকা সম্পাদকের নিজস্ব নহে; সমিতির টাকা। দেওয়ান বাহাদুর যদি নিতান্তই ঐ টাকা চান, ক্ষত্রিয় সমিতির সম্পাদকের বরাবর চিঠী লিখিতে পারেন; চিঠী পাইলে সমিতি নিজ কর্ততব্য অবধারণ করিবেন।” এবং তাঁর শেখানাে বুলিই মাথাভাঙ্গার তৎকালীন ক্ষত্রিয় সমাজ অক্ষরে অক্ষরে পালন করিয়াছিলেন। তাই তাে তাদের শত সমস্যা, ঝঞ্ঝা, অত্যাচারের কালেও তারা এক স্বরে উচ্চ কণ্ঠে বলিয়াছেন, টাকা প্রায়শ্চিত্তের টাকা-সমাজের দান-ক্ষত্রিয় সমিতির ধনভাণ্ডারে দেওয়ার জন্য তাহাদের নিকট গচ্ছিত আছে; টাকা তাহাদের নহে; অন্য কাহাকেও সেই টাকা দিবার অধিকার তাহাদের নাই; দেওয়ান বাহাদুর যদি ঐ টাকা চান, তবে ঐ টাকা তাহারা সম্মুখেই ধরিয়া আছেন, কাড়িয়া লইয়া যাইতে পারেন। কুচবিহারবাসী হউক বা রংপুরবাসী হউক বা অন্য অঞ্চলের নিবাসী হউক, ক্ষত্রিয়গণের সমাজ এক; ক্ষত্রিয় সমিতি সেই সমাজের কেন্দ্র; ক্ষত্রিয় সমিতির ধনভাণ্ডারই সমাজের ধনভাণ্ডার-রক্তভাণ্ড, হৃদয়।

তবে আশুতােষ ঘােষ তৎকালীন সময়ে ক্ষত্রিয় সমিতির উপর প্রশাসনিক উচ্চ পদে থেকে অসৎ উপায়ে প্রশাসনিক পদকে অপব্যবহার করেও বিফলই হয়েছিলেন। কারণ তাঁর হয়ত কোন ধারণা ছিল না যে পঞ্চানন বর্মার মত ব্যক্তিত্ব যেখানে ক্ষত্রিয় সমিতির সম্পাদক সেখানে তিনি সফল হতে পারেনই না।


# Mathabhanga Kshatrya Samiti # Nayeb Ahilkar Ashutosh Ghosh # Panchanan Barma # Hedella Barma # Khirnarayan Barma # Misrule by Nayeb Ashutosh Gosh # Cooch Behar Kshatrya # Rangpur Kshatrya #Koch Rajbanshi # Kamtabihari bhasha sahitya

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


The reCAPTCHA verification period has expired. Please reload the page.