কুচবিহার রাজবংশের পরিচিতি।

কুচবিহার বা কোচবিহার রাজবংশের পরিচিতি

লিখেছেন: কুমার মৃদুল নারায়ণ

খেন রাজবংশের পর বিভিন্ন গ্রামে ভূঁইয়া গণ স্বাধীনভাবে নিজ নিজ অঞ্চলে প্রভুত্ব করতেন। এই সময়ে মেচ দলপতি হরিদাস মণ্ডল বা হারিয়া মন্ডল নামে এক মেচ সর্দার অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। কোচ নায়ক হাজোর হীরা ও জিরা নামক দুই কন্যার বিয়ে হয় মেচ যুব হাড়িয়া মন্ডল এর সঙ্গে। হরিদাস মন্ডল গোয়ালপাড়া জেলার চিকনা পর্বত বাসী ছিলেন। জ্যেষ্টা পত্নী জিরার গর্ভে চন্দন ও মদন নামে দুই পুত্র জন্মগ্রহণ করে। কনিষ্ঠা পত্নী হীরার গর্ভে শিবের আশীর্বাদে দুই পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। শিশু (শিষ্যসিংহ) ও বিশু (বিশ্বসিংহ)। ১৫১০ খ্রিস্টাব্দ চন্দন প্রথম রাজা হন। তিনি পাঁচ বছর রাজত্ব করেন।

মহারাজা বিশ্ব সিংহ (১৫১৫-১৫৩৩ খ্রীষ্টাব্দ)

চন্দন এর মৃত্যুর পর বিশ্বসিংহ ১৫১৫ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে আসীন হন, মতান্তরে তিনিই প্রথম রাজা। কোচ রাজাদের মধ্যে বিশ্ব সিংহ প্রথম কান্তেশ্বর উপাধি ধারণ করে কামতা রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন। তিনি রাজধানী হিঙ্গুলাবাসে স্থানান্তরিত করেন। তিনি সৌমার দেশ  বিজনি, বিজয়পুর, জয়  করেন। ভুটানের রাজা তাকে কর ও  উপঢৌকন দিতে স্বীকৃত হন। গৌড়ের কিছু অংশ তিনি দখল করেছিলেন। ষোড়শ শতাব্দীর প্রারম্ভে বিশ্ব সিংয়ের রাজ্যভিষেককালীন তার ভাই শীর্ষ সিংহ মাথায় ছত্র ধারণ করলে তিনি রায়কত  বা দূর্গাধিপতি (Cheif of Fort) উপাধি প্রাপ্ত হন। এই শিষ্যসিংহ বর্তমান জলপাইগুড়ি শহরের বক্ষে বৈকন্ঠপুর এর রায়কত বংশের সূচনা করেন। বিশ্ব সিংহ তার পুত্র নরনারায়ণ ও শুক্লধজকে শিক্ষার জন্য বারানসী পাঠিয়েছিলেন। তারা সংস্কৃত, ব্যাকরণ, সাহিত্য, জ্যোতিষ ,স্মৃতি,ও পুরাণে ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। বিশ্ব সিংহ ছিলেন শিবদুর্গার একান্ত উপাসক। 

মহারাজা নর নারায়ণ (১৫৩৩-৩৪-১৫৮৭ খ্রীষ্টাব্দ)

বিশ্ব সিং এর মৃত্যু হলে নরসিংহ তার জ্যেষ্ঠপুত্র হলেও দ্বিতীয় পুত্র নরনারায়ণ কোচবিহারের রাজ সিংহাসনে বসেন। তিনি নারায়নী মুদ্রার প্রচলন করেন। অসমের ধর্মগুরু শংকরদেবের আশ্রয়গ্রহণ ও তার ধর্মপ্রচার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৈষ্ণবভক্তদের ইতিহাস বিস্তার লাভ করে । শংকরদেবের আশ্রম এ স্থান মধুপুর। এখনো কুচবিহারের মধুপুর গ্রামে আসামের অগণিত মানুষ প্রতিবছর পুণ্যের  জন্য আসেন। নরনারায়ণ ও তার ভাই  চিলারায় উভয়ে  ধার্মিক ছিলেন। তিনি তার ভাইয়ের সাহায্যে রাজ্যকে সাম্রাজ্যের রূপ দেন।তিনি অহম, কাছার, মনিপুর, জয়ন্তিয়া, শ্রী হট্ট, ত্রিপুরা, খাইরুম, ডিমরুয়া প্রভৃতি রাজ্য জয় করেন। তবে গৌড় আক্রমণ করে সফল হননি। তার ১৫৫৫ খ্রিস্টাব্দে অহম রাজ কে লেখা চিঠি প্রথম বাংলা গদ্যের নিদর্শন বলে স্বীকৃত হয়। চিঠিটি ছিল এই রূপ “তোমার আমার সন্তোশ সম্পাদক পত্রাপত্রি গতায়াত হইলে উভয়ানুকুল প্রীতির বীজ অঙ্কুরিত হইতে রহে। তোমার কর্তব্যে সে বর্ধিতাক পাই পুষ্পিত ফলিত হইবেক “। সংকোশ নদী কে সীমান্ত করে পূর্বদিকে নিজ অধিকার রাখেন এবং পশ্চিম দিক ভাই শুক্লধজকে দেন। তিনি বড় দেবীর পূজা প্রচলন করেন এবং কামাখ্যা মন্দির পুনর্নির্মাণ করেন। তিনি শিক্ষা এবং সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

মহারাজা লক্ষীনারায়ণ (১৫৮৭-১৬২৭ খ্রীষ্টাব্দ)

মহারাজা নরনারায়ণের মৃত্যু ঘটলে পুত্র  লক্ষীনারায়ণ সিংহাসনে আরোহন করেন। তিনিও স্বনামে মুদ্রার প্রচলন করেন। তিনিও অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ ছিলেন। মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে তার বিরোধ ও রাজ্যের অনেকাংশ মোঘলরা দখল করেন। মোঘল সেনাপতি মানসিংহ সাথে সন্ধি 1596 খ্রিস্টাব্দে ও তার সাথে বোন  প্রভাবতীর বিয়ে দেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় অনেক গ্রন্থ রচিত হয়।

Continue Reading..

Share this:

Leave a comment

Enable notifications on latest Posts & updates? Yes >Go to Home Page or Non Amp version Page and \"Allow\"