চিলারায় গড়, স্মৃতি রোমন্থন ও কিছু তথ্য।

তুফানগঞ্জ নৃপেন্দ্রনারায়ণ মেমোরিয়াল হাইস্কুলের পিছনে দড়িয়াবালাই রোড ধরে মোটামুটি 2.5 কিমি পথ অতিক্রান্ত করলে অন্দরান ফুলবাড়িতে বিশ্ব মহাবীর চিলারায়ের গড়। ছোটোবেলা থেকে আমরা চিলারাজার কোর্ট বলতাম ঐ গড় কে। কুচবিহার রাজ্যের নায়েব আহিলকার হরেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর দি কুচবিহার স্টেট অ্যান্ড ইট্স ল্যান্ড রেভিনিউ সেটলমেন্ট (1903 খ্রীষ্টাব্দ) বই তে বীর চিলারায়ের এই গড়ের উল্লেখ আছে। সেখানে তুফানগঞ্জের নাম ফুলবাড়ি বলা হয়েছে। অর্থাৎ বর্তমান তুফানগঞ্জের আগের নাম ফুলবাড়ি ছিল। বাবা কাকারা সবসময় ফুলবাড়িই বলত। যখন গ্রাম থেকে তুফানগঞ্জ শহরে যেত নানান কাজে তখন বলত আজি ফুলবাড়ি হাট যামো বা অমুক জিনিসটা ফুলবাড়ি হাট না গেইলে পাওয়া যাবার নয়। আমরাও যখন ছোটোবেলায় গ্রাম (বিলসী 2) থেকে কেনাকাটার জন্য  তুফানগঞ্জে যেতাম তখন ফুলবাড়ি বলতাম। বিলসী থেকে ফুলবাড়ি যাওয়ার শর্টকাট রাস্তা হল চিলারাজার কোর্ট হয়ে যাওয়া। আগে (1990 মোটামুটি) রাস্তাঘাট পাকা ছিল না। রাস্তায় সরকারী বা বেসরকারী বাস, অটো চলত না। হেটে অথবা সাইকেলে যেতে হত অথবা ভারী জিনিস আনার জন্য গরু বা মোষের গাড়ি।

ছোটোবেলায় চিলারাজার গড়কে যেমন দেখেছিলাম।

চিলারায়ের গড় কে বেশী করে মনে পরে এইজন্য কারন ঐ গড়ের পাশ দিয়ে আমার বা আমাদের তুফানগঞ্জ শহরে যাতায়াতের পথ ছিল। 6-7 বছর বয়সে যখন মায়ের সাথে হেটে ফুলবাড়ি যেতাম তখন চিলারায়ের গড় গা ঘেষা বিশাল বড় বাঁশ বাগানের পূব কোনায় কাচা রাস্তার (যে রাস্তাটি তুফানগঞ্জ হরিরধামনাটাবাড়ি মেইন রাস্তা থেকে গিয়ে ঐ বাঁশ বাগানের কোনা স্পর্শ করে অন্দরান ফুলবাড়ি হয়ে দড়িয়াবালাই রোড ধরে তুফানগঞ্জে গেছে ) উপর একটু বিশ্রাম নিতাম। আগে ঐ কোনাটাতে ইলেকট্রিক এর অনেক খুটি ও ট্রান্সফর্মার ছিল (হাইটেনশন থেকে লো টেনশন করার জন্য), যদিও বিদ্যুতের তারগুলি চুরি হয়ে গিয়েছিল।

যাইহোক ঐ গা ছম ছম করা বাঁশ বাগানের কোনায় বিশ্রাম নিয়ে আবার চলা শুরু করতাম তুফানগঞ্জের দিকে এবং পুরো পথ যেতাম ধান জমি বা ডাবরি বাড়ির মাঝ দিয়ে। ঐ বাঁশ বাগানের পাশে কয়েকটা বাড়ি ছিল তখন। জলতেষ্টা পেলে ঐ বাড়িগুলির কোনো একটাতে ঢুকে জল পান করে তেষ্টা মেটাতাম। আমার বাবা মাকে ওনারা চিনত বা জানত এইটুকু মনে আছে। আমার বাবার মামার বাড়ি ছিল (বাবার মামা মারা যাবার পর নিঃসন্তান মামি আমাদের বিলসীর বাড়িতে অনেকদিন করে থাকত যা মা ও কাকীদের বিভিন্ন ঘরোয়া গল্পে শুনতাম, বাবার ঐ মামার নাম “নেকনাই” আর মামীর নাম “নাইতো” ; নাইতো বুড়ি বলে ডাকত সবাই, এসব আমার জন্মের আগের কথা বা আনুমানিক 1960-65 সালের কথা। ) ঐ বিশাল বাঁশ বাগানের অপর কোনে (দক্ষিণ পশ্চিম দিকে, ডাকুয়া পাড়া বলে)। এইজন্যই হয়ত বাবা মাকে বা আমাদের পরিবারের সঙ্গে ঐ বাড়িগুলির চেনা পরিচিতি ছিল। বর্ষাকালে সুকানি নদী পাড় করার সময়ও ওনারা সাহায্য করত ভেলা দিয়ে বা কখনো ছোটো নৌকো দিয়ে। 

এখন দড়িয়াবালাই রোডের বটতলা মোড় থেকে চিলারায়ের গড় পর্যন্ত পাকা রাস্তা হয়েছে কিন্তু সেই সময় সরু কাচা রাস্তা ছিল গড়ের পাশে কলোনি পর্যন্ত, বাকী পায়ে হাটা পথ গড়ের মাঝ দিয়ে গিয়ে স্রোতহীন নদী (নদীর নাম ছিল সুকানি নদী, As per TCSAILRS, HM Chowdhury1903) বা খোড়ার পাড় পর্যন্ত, খোড়ার নিচু জমি পাড় করে অপর প্রান্তে কয়েকটা বাড়ি তারপর বিশাল বাঁশ বাগানের পূব কোনা যেখানে আমরা বিশ্রাম নিতাম। গড়ের পাশে পুরানা স্রোতহীন নদীটা বর্ষাকালে ভেলা করে পাড় হতে হত। চিলারায়ের গড়ে তখন মাত্র কয়েকটি উদ্বাস্তু বাড়ি ছিল আর বাকী জায়গাটা গাছগাছালিতে ভরা ছিল, ঘনজঙ্গলই বলা যায়। মাটির ঢিবির উচ্চতা এখন যতটা তখন আরো অনেক বেশী ছিল। বর্তমানে যে কয়েকটি পাথরখন্ড রাস্তার পাশে রয়েছে সেই পাথরখন্ডগুলি উদ্বাস্তু বাসীরা বাড়ি করার জন্য মাটি খুড়ে পেয়েছিল।

চিলারায়ের গড় মোটামুটি 54 বিঘা জমির উপর ছিল কিন্তু বামফ্রন্ট সরকার বেশীরভাগ জমি খাস করে উদ্বাস্তুদের দান করে। বর্তমানে গড়ের মাঝে শুধু খেলার মাঠটাই রয়েছে সর্বজনের জন্য। 

ছোট বেলা থেকে চিলারায়ের গড় এর নাম মুখে মুখে শুনতাম ও গড়ের জায়গাটি দেখতাম। কিন্ত কে এই চিলারায়? সেটা জানতাম না। অনেক কে এই ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করতাম, কেউ শুধু কুচবিহারের রাজা ছাড়া আর কিছুই জানত না। আর বেশীরভাগ কিছুই জানত না। সুতরাং ক্লাস V-VI থেকে চিলারায়ের ব্যাপারে জানার ইচ্ছাটা বড়াবড়ই ছিল। সমস্যা ছিল যে কোনো বই হাতের নাগালে ছিল না যে চিলারায় গড় বা চিলারায় সম্পর্কে জানা যেত। 

হরেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর দি কুচবিহার অ্যান্ড ইট্স ল্যান্ড রেভিনিউ সেটলমেন্ট বইটিই প্রথম হাতের নাগালে পাই (তাও মাত্র 4 বছর আগের কথা)। সেখানেই প্রথম দেখতে পাই তুফানগঞ্জের চিলারায় গড় লিপিবদ্ধ রয়েছে। 

চিলারায় গড় সম্পর্কে নায়েব আহিলকার হরেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী যা বর্ণনা দিয়েছেন 1903 সালে –

“Of the remains of antiquities connected with the early rulers of Koch dynasty, the gars or fortifications and temples in the eastern part of the country, called Pargana Tufangunj, deserve mention. These were erected in the sixteenth century by Chila Roy, as Sukladhvaja, the illustrious brother of Maharaja Naranarayan, is popularly known. 

Chila Roy, before he went to live in Assam, had his residence in Taluk Fulbari, where the Head-quarters of theTufangunj Sub-division are now located. The place is 15 miles east of Cooch Behar, and lies on the right bank of the Dipa-Raidak. Chila Roy had his house in what is now Taluk Andaran Fulbari, on the banks of the Sukani Nadi, and his andar or inner appartment, from which the Taluk was afterwards named, was surrounded by a high rampart. The outer appartment lay east of the enclosed area, and had evidently several structures, either wholly or partly of brick, as the mounds of earth mixed with bricks and brick-bats clearly testify. 

The late earthquake of 1897 caused several fissures in this place, one of which disclosed the lower portion or plinth of a brick wall. These ruins have not yet been fully explored. About two miles south-east of the andar are the ruins of a fortification in Taluk Kamat Fulbari, and a big old tank called Chila Ray’s Dighi. The fortifications are oblong in shape and are composed of one smaller enclosure within a larger one. There are remains of small tanks within these walls. The granaries and public offices of the chief were situated here. 

The Fulbari Bunder has been built within these small gars. The adjacent lands contained the remains of several pucca wells which were washed away at the opening of the Raidak. Chila Roy established two Thakurbaris, one in Taluk Nak-kati-gach, three miles south of his own residence, and the other in Barakodali at about the same distance to the east. In either of these places a temple was built and a tank excavated for the worship of Mahadeva. The Shiv established in Nak-kati-gach is called Chhota-Mahadeva, and that in Barakodali, Bara-Mahadeva. Both these gods were largely endowed. The temples are now in ruins, and tin sheds have been erected by the State for housing the gods, to whom daily pujas are offered at the expense of the State” (Coochbehar State).

এই বইটিতে চিলারায় ও চিলারায় এর গড় সম্পর্কে জানার পর আমি সোসাল মিডিয়াতে অনেক বার পোস্ট দিয়েছিলাম যাতে এখানকার ভুমিপুত্র তথা সাধারন জনগন এই কামতাভুমির ইতিহাস সম্পর্কে অবগত হয়। এই ভুমির প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য কে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ব্রত হয়। আশ্চর্যের বিষয় ভারত স্বাধীন হবার আগে কুচবিহার রাজ্যের রাজারাও চিলারায় গড় নিয়ে সেরকম কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। স্বাধীন ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গের সাথে কোচবিহার যোগ হবার পর তো কলকাতা পরিচালিত পশ্চিমবঙ্গ সরকার কোচবিহারের ইতিহাস ও ঐতিহ্য কত তাড়াতাড়ি মুছে ফেলা যায় সেই চেষ্টায় রত। এইজন্যই পাঠ্য বই এ কামতাভুমির কোনো ইতিহাস নেই। এটা কোনো আশ্চর্যের বিষয় নয় যে সরকারী বদান্যতায় চিলারায়ের গড় এ আপনি স্বামী বিবেকানন্দ বা কবিগুরু রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের বা নেতাজীর মূর্তি দেখলেও দেখতে পারেন ভবিষ্যতে। কিন্ত সরকারী বদান্যতায় চিলারায়ের নিজের দূর্গে নিজের মূর্তি নাও থাকতে পারে! 

©VSarkar

Share this:

7 thoughts on “চিলারায় গড়, স্মৃতি রোমন্থন ও কিছু তথ্য।”

    • No doubt. But we are also responsible. Our elected members of legislative as well as Loksabha assembly did nothing since independence. All were hypnotised by so called state and national political party. Till now people are under darkness. Some educated doing such politics for own interest only. We should aware our villagers, if they get right direction it will be easy way to capitalise our whole demand. Thank you for your comments

      Reply
  1. Very informative article. I get to know past history of our own place. Thank you for the writing.
    Unfortunately, these facts are absent in the mainstream history books especially school/college text books. We should come up with own efforts for own cause.

    Reply

Leave a comment