এসসি (SC) এসটি (ST) ক্ষত্রিয় কোচ রাজবংশী – কি লাভ বা ক্ষতি?

এসসি (SC) এসটি (ST) ক্ষত্রিয়  কোচ   রাজবংশী – কি লাভ বা ক্ষতি

প্রথমেই বলে নেয়া যাক এসসি কারা আর এসটি কারা বা কিসের ভিত্তিতে কোনো জনগোষ্ঠী এসসি বা এসটি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। 

এসসি (Scheduled Caste)

1.ভারতের সংবিধান অনুযায়ী কোনো জনগোষ্ঠী এসসি (SC – Scheduled Caste) মর্যাদা তখনই পাবে যদি –

2.শিক্ষা ক্ষেত্রে পশ্চাদপসরণ হয় (educational backwardness) 

3.অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পশ্চাদপসরণ হয় (economic backwardness) 

4.সামাজিক ক্ষেত্রে অতি পশ্চাদপসরণ (extreme social backwardness) 

5.কারণ / প্রমাণ হিসাবে জনগোষ্ঠীর সাথে প্রথাগত বা ঐতিহ্যগত অস্পৃশ্যতার ঘটনা জড়িত। (traditional practice of untouchability) 

সংবিধানের 341(1) আর্টিকেল অনুযায়ী হিন্দু, শিখ ও বৌদ্ধ ধর্মের কোনো জনগোষ্ঠী এসসি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। 

যদি কোনো হিন্দু বা বৌদ্ধ বা শিখ এসসি ব্যক্তি ধর্ম পরিবর্তন করে খ্রীষ্টান বা মুসলিম বা অন্য ধর্মে চলে যায় তাহলে এসসি সুবিধা পাবেনা। 

যদি কোনো নন এসসি ব্যক্তি কোনো এসসি ব্যক্তিকে বিবাহ করে তাহলে বৈবাহিক সূত্রেও নন এসসি ব্যক্তি সিডিউল্ড কাস্ট সুবিধা পাবেনা। 

যদি কোনো এসসি ব্যক্তি নন এসসি ব্যক্তিকে বিবাহ করে তাহলে বিবাহের পরেও এসসি ব্যক্তি সিডিউল্ড কাস্ট সুবিধা পাবে। 

যদি কোনো নন এসসি ব্যক্তি এসসি ব্যক্তিকে বিবাহ করে তবে তার বংশধররা এসসি হবে কিনা সেটা নির্ণয় করবে ঐ সিডিউল্ড কাস্ট কমিউনিটি বাচ্চাদের (বংশধর) কে সিডিউল্ড হিসাবে গ্রহণ করেছে কিনা তাদের কমিউনিটির সদস্য হিসাবে এবং সে ঐ কমিউনিটির চারপাশের পরিবেশে বড় হয়েছে কিনা। যদি বাচ্চা/ বাচ্চাগুলোকে ঐ সিডিউল্ড কাস্ট কমিউনিটি গ্রহণ করে এবং কমিউনিটির দম্পতির কাছে বড় হয় তাহলে তাকে এসসি হিসাবে ধরা হবে। তবে প্রত্যেকটি ব্যাপার যোগ্যতার সহিত বিচার্য্য বা নিরীক্ষিত হবে। 

এসটি (Scheduled Tribe)

ভারতের সংবিধান অনুযায়ী কোনো জনগোষ্ঠী এসটি (ST – Scheduled Tribe)মর্যাদা পাবে যদি –

1. আদিম উপাদান সংস্কৃতিতে বিদ্যমান (indication of primitive traits) 

2. স্বতন্ত্র সংস্কৃতি থাকে (distinctive culture) 

3. ভৌগলিক ভাবে আলাদা অবস্থান করছে (geographically isolated) 

4. বৃহৎ কমিউনিটির সংস্পর্শে সংকোচ বোধ (shyness of contact with the community at large) 

5.. পশ্চাদপসরণ ( backwardness)

এক রাজ্যের এসসি অন্য রাজ্যে চাকরীর পরীক্ষায় সুযোগ পাবে কিনা? 

পাবেনা। এসসি লিস্ট স্টেট স্পেসিফিক। এসসি সুযোগ সুবিধা শুধু ঐ রাজ্যেরই পাবে যে রাজ্যে তার স্থায়ী বসতি বা যে রাজ্য থেকে কাস্ট সার্টিফিকেট নেওয়া হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় সরকার ও তার স্পনসরড চাকরীগুলিতে সব রাজ্যের এসসি সুবিধা পাবে। 

কোচ রাজবংশীর ক্ষেত্রে এই সমস্যা এখনো আছে। কারণ প্রত্যেক রাজ্যে আলাদা আলাদা নাম। 

আসাম – কোচরাজবংশী (ওবিসি, entry no. 18 of central list) , 

পশ্চিমবঙ্গ – কোচ ও রাজবংশী আলাদা নামে লিস্টে আর দুটোই এসসি, 

বিহার – কোচ (entry no. 12) ও রাজবংশী (রিষিয়া ও পলিয়া, entry no. 107) আলাদা নামে, দুটোই ওবিসি, 

মেঘালয় – কোচ (এসটি/ ST) 

বাংলাদেশেও কোচ রাজবংশী আছে তবে ওখানে নাকি অনেকে নিজেদেরকে ক্ষত্রিয় বলে গর্ববোধ করে। অর্থাৎ জাতি নামে তারা পরিচিতি চায় না, বর্ণভেদে চায়, হিন্দু বাঙালি হিসেবে কোন বর্ণের থাকবে এটা ধরে নেওয়া যেতে পারে কিনা জানিনা। তবে আজকাল কোচ রাজবংশী বর্মন মিলেমিশে সংগঠন করছে আদিবাসী (ST) মর্যাদা পাবার জন্য।

এই লেখাটি যেহেতু ভারতীয় সংবিধানের উপর নির্ভর করে কিছু জিনিসের আলোকপাত করা হয়েছে তাই বাংলাদেশের বা নেপালের কোচ রাজবংশীর ব্যাপারে বেশী কিছু লিখছিনা। 

কোচ রাজবংশী – তফসিলি জাতি – ক্ষত্রিয়

আমরা যখনই রাজবংশীর কথা বলি তখনই কোচ শব্দটা জুড়ে যায়, তর্ক বিতর্ক হয়। প্রশ্ন হল কি এমন রহস্য আছে যেখানে রাজবংশী শব্দের সঙ্গে কোচ শব্দটা অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িত। অন্য তফসিলি জাতি যেমন কৈবর্ত, নমশূদ্র ইত্যাদির সঙ্গে তো রাজবংশী শব্দটাকে নিয়ে কখনো বিতর্ক হয়না। এই ব্যাপারে পরে আলোচনা করছি, তার আগে কিছু ডাটা নিয়ে আলোচনা করি। 

আমরা সবাই জানি শিক্ষার ক্ষেত্রে যে সংরক্ষণ আছে তাতে এসসি – 15%, এসটি – 7.5% (পশ্চিমবঙ্গে SC-22%, ST-7%, OBC-8%)। ভারতের মোট জনসংখ্যার 19% হল এসসি জনসংখ্যা এবং 8% এর মত এসটি জনসংখ্যা। কোচ বা রাজবংশী বা কোচরাজবংশীর জন্য আলাদা করে কোনো সংরক্ষণ নেই, থাকার কথাও না। 

যদি কেউ বলে থাকে এসটি তো মাত্র 7% সংরক্ষণ, রাজবংশীর এসটি হয়ে কি লাভ? এইভাবে যদি বিচার করা হয় তাহলে ভুল। কারন সংখ্যাও কম এবং সংরক্ষণ এর শতাংশ ও কম। এসসি আর এসটির মধ্যে ফারাক হল এসসি তে ভুমির সংরক্ষণ বলে কিছু নেই। অর্থাৎ বহিরাগত যে কেউ এসসি তথা কোচ রাজবংশীর জমি কিনতে পারবে, এমনকি আইনের ফাক ফোকর বের করে প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে অনায়াসে দখলও করতে পারবে যা অতীতে হয়েছে। এসটির ক্ষেত্রে বহিরাগত কেউ এমনকি এসটি বাদ দিয়ে কেউ জমি কিনতে পারবে না। কোচ রাজবংশীরা যতই নিজেদের ভুমিপুত্র দাবী করুক, সংবিধানের বিচারে আদতে তা নয়। একমাত্র এসটি জনগণই ভুমিপুত্র। কাজেই 15% সংরক্ষণ এর জন্য সারা ভারতে SC জনসংখ্যা আছে 19% এর মত, পশ্চিমবঙ্গে এসসি% একটু লিঙ্ক চেক করে দেখে নিন । 

2001 census report/ West Bengal

এবার কথা হল ভারতের মধ্যে কোচবিহার বা কুচবিহারে সবথেকে এসসি জনসংখ্যা বেশী, 50% এর মত। এই 50% এসসি জনসংখ্যার মধ্যে রাজবংশী কত শতাংশ জানা নেই তবে 60% ও যদি ধরে নিই, জেলা লেভেলে শিক্ষা বা চাকরীর ক্ষেত্রে কিন্তু অনেকটাই গ্যাপ থেকে যাচ্ছে কোচ রাজবংশীর জন্য। সেক্ষেত্রে 100% রোস্টার মেনে চললেও গ্যাপ থেকে যায়। 

অতীতে দেখা গেছে স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে যখন মেরিট লিস্ট বের করা হত তখন জেনারেল এর আলাদা লিস্ট এসসির আলাদা লিস্ট ওবিসির আলাদা লিস্ট বের করা হত। এটা কিন্তু বেআইনি। উত্তরের জেলাগুলি যেহেতু কোচ রাজবংশী অধ্যুষিত সেক্ষেত্রে বন্চিত হলে কোচ রাজবংশী ছাত্র ছাত্রীরা বন্চিত হয়েছে। নিয়ম হল মেরিট লিস্ট কমন এবং একটাই বের করার যেখানে একজন এসসি বা ওবিসি বা এসটি ছাত্র ছাত্রী প্রথম স্থানে থাকতে পারে তার মেরিট /নম্বর অনুযায়ী। ধরুন কলেজে ভর্তির জন্য 10 টা সিট রয়েছে তার মধ্যে 3টা এসসি সিট, মেরিট লিস্টে প্রথম দশে যদি 3জন এসসি রাজবংশী ছাত্র ছাত্রী থাকে তাহলে সে ইচ্ছা করলে জেনারেল এ ভর্তি হতে পারবে। সেক্ষেত্রে 10 পরে যে 3জন এসসি ছাত্র ছাত্রী আছে মেরিটে তারাও ভর্তি হতে সক্ষম হবে। অর্থাৎ 10 জনের মধ্যে সর্বমোট 6 জন এসসি ছাত্র ছাত্রী ভর্তি হল। বাকী চারজনের মধ্যে এসটি, ওবিসি ও জেনারেল থাকবে। 

চাকরীর ক্ষেত্রেও একইরকম মেরিট লিস্ট যেন কমন থাকে। জেনারেল, এসসি, ওবিসি এসটি যেন আলাদা আলাদা নাহয়, এটা বেআইনি। প্রশাসনের পদাধিকারীরা যেহেতু বেশীরভাগ ক্ষেত্রে জেনারেল থেকে ওরা এই অসাংবিধানিক কাজটি করে থাকে, চুপ করে থাকলে চলবে না। কোচবিহার সহ উত্তরবঙ্গের বাকী জেলাগুলি যেহেতু কোচ রাজবংশী অধ্যুষিত সেক্ষেত্রে আলাদা আলাদা লিস্ট বের করলে সব এসসি কাস্টের সঙ্গে কোচ রাজবংশীরও ক্ষতি। 

কোচ আর রাজবংশী এক না আলাদা

যেসকল ঐতিহাসিক গ্রন্থ (Ralf Fitch, Tabakat-i-Nasiri, Akbarnama সহ যত British লেখকের বই রয়েছে) আছে তাতে কামতাপুর অর্থাৎ দিনাজপুর, রঙপুর (বাংলাদেশ), দার্জিলিং, অবিভক্ত জলপাইগুড়ি, অবিভক্ত গোয়ালপাড়া অর্থাৎ লোয়ার আসামের সবাইকে কোচ উল্লেখ করা হয়েছে যারা মুই, তুই, কোটে যাইবেন, উকটাও, সোন্দাও, আকলাও, পচকরি, পাটানি, বুকুনি এই শব্দগুলো ব্যবহার করে  ভাব বিনিময় করেছে।

রঙপুরে 1872 সালে যখন সেনসাস হয় তখন কয়েকজন জোতদার  (হরমোহন খাজান্চী মহাশয় সহ অনেকে) সেনসাসে ব্রাত্য ক্ষত্রিয় লেখার জন্য জিগির তোলেন অর্থাৎ এই ভাষার মানুষেরা ক্ষত্রিয় জাতির যেহেতু ক্ষত্রিয় সংস্কার থেকে বহুদিন ব্রাত্য তাই ব্রাত্য ক্ষত্রিয় (জনগননা, ক্ষত্রিয়, কোচ, রাজবংশী – তর্ক বিতর্ক – বই পড়ুন ), ইত্যাদি অনেক কাহিনী আছে। সামাজিক ভাবে ক্ষত্রিয় করণ হবার পরে কোচ শব্দ কে অস্বীকার করে নতুন নাম রাজবংশী ও কোচ উভয় নাম কে পশ্চিমবঙ্গে তফসিলি তালিকাভুক্ত হয়েছে বলে অনেক তথাকথিত উঁচু জাত হিন্দু এটা মেনে নিতে চাননি, এখনো চায় কিনা সন্দেহ আছে (সামনে বা সরাসরি কেউ কিছু বলেনা, মনোভাব বুঝে নিতে হয়)। কোনটা চায় না? ক্ষত্রিয় হিসেবে মেনে নিতে না তফসিলি হিসেবে এটাও অজানা।

নিজেদের প্রগতিশীল মানুষ কোচ নামকে ক্ষত্রিয় হিসেবে স্বীকার করেনি আর উঁচু জাত বাংলা হিন্দু সমাজ রাজবংশী নামকে কে ক্ষত্রিয় হিসেবে স্বীকার করেনি সেই অর্থে। মানুষ গুলো একই – বিনা কারণে বিভক্ত, এখন যেমন কামতাপুরি না রাজবংশী ভাষা – একই ভাষার দুই নাম, এখানেও সেই বঙ্গ সরকার।

সমাজে সার্বিক ভাবে যখন টানা পোড়েন রয়েছে তবে কোচরাজবংশী একত্রে লিখতে কি অসুবিধা?আমি মনে করি ভারতের সমস্ত রাজ্যে এক নাম কোচরাজবংশী হিসেবেই থাকুক। কেউ মনে করুক আর না করুক নিজেরা নিজেদের ক্ষত্রিয় মনে করুন, বাস্তবেও তাই। এসসি হলে ক্ষত্রিয় আর এসটি হলে নিচু জাত বা ক্ষত্রিয় নন এটাও ভুল ভাবনা বলে মনে করি। কারন এখানে আপনি যাই মনে করুন নিজেকে তাতে অন্যের কিছুই যায় আসেনা। ভুমির অধিকার নিয়ে সাংবিধানিক মোহড় দাবী করুন দেখবেন অনেকের মনে জ্বালা ধরবে। আপনি নিজের ভাষা কৃষ্টি সংস্কৃতি আর ভুমি (very important)সংরক্ষিত রেখে কতটা শিক্ষা – অর্থে – উৎকর্ষে (virtue, skill) এগিয়ে যেতে পারেন, এটাই মাপকাঠি।

আমার বিশ্বাস নবপ্রজন্ম দূরদর্শী হয়ে সঠিক নামের দিকে দৃষ্টিপাত করবে কোনও তৃতীয় শক্তির দ্বারা পরিচালিত না হয়ে, – যা একতা নিয়ে আসবে নিজেদের মধ্যে এবং অন্য সমাজের মধ্যেও।

©VSarkar

Share this:

Leave a comment