Categories
ABORIGIN ভাষা - বাংলা

বিশ্ব মহাবীর চিলা রায় ও কামতা সাম্রাজ্য।

যতো ধর্ম  স্ততো জয়

জয় মহারাজকুমার শুক্লধবজের জয়।
জয় বিশ্ব মহাবীর চিলা রায়ের জয়।

Kumar Mridul Narayan, Author/Contributor

কামতারাজ বিশ্বসিংহ প্রতিষ্টিত কুচবিহার রাজবংশের যে সূচনা করেছিলেন তার পূর্ণতা লাভ করেছিল তার সুযোগ্য উত্তরসূরি দুই পুত্র মহারাজা নর নারায়ণ এবং তার ভাই ও প্রধান সেনাপতি শুক্লধজ ওরফে চিলারাই (See details in English) এর হাত ধরে। চিলারাই এর সাহসিকতা, প্রগাঢ় পাণ্ডিত্য, অসামান্য শৌর্যবীর্য, স্বাভাবিক নিঃস্বার্থপরতা, অবিচলিত ভাতৃপ্রেম  এবং বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে মহারাজা নরনারায়ণ কুচবিহার রাজ্যেকে সাম্রাজ্যে পরিণত করেছিলেন।

জন্ম ও বিদ্যাশিক্ষা

বিশ্ববীর  চিলা রাই (১৪৩২শক, ৯১৫ বঙ্গাব্দ ) মাঘ মাসের পূর্ণিমা (১৫১০ খ্রী ) তিথিতে মহারাজা বিশ্বসিংহের পত্নী পদ্মাবতীর গর্ভে (দরং বংশাবলিতে উল্লেখিত) সুদাগ্নির গর্ভে (গন্ধর্বনারায়নের বংশাবলিতে উল্লেখিত) জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রকৃত নাম ছিল শুক্লধ্বজ। ছোট বেলা থেকেই তিনি যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন, ব্যকরণ, সাহিত্য, জ্যোতিষ, শ্রুতি , স্মৃতি, ন্যায়, মীমাংসা, প্রভৃত বিষযে তার ছিল অগাধ পাণ্ডিত্য। মহারাজা বিশ্বসিংহ রাজকুমার মল্লদেব (নরনারায়ণ) ও শুক্লধজ (চিলারাই) এর প্রখর বুদ্ধি ও শক্তির প্রাচুর্য দেখে এই দুই পুত্রকে নিজেদের দায়িত্বশীল করে তুলতে বারানসী পাঠান  ব্রহ্মানন্দ বিশারদ এর কাছে।জ্যেষ্ঠ পুত্র নরসিংহ মহারাজার অত্যন্ত স্নেহভাজন ছিলেন। কথিত আছে অতিরিক্ত স্নেহের কারণে তাকে বিদেশে না পাঠিয়ে রাজধানীতেই নানারকম শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন মহারাজা। ১৫৩৩ খৃস্টাব্দে মহারাজ বিশ্বসিংহর  মৃত্যু  হলে তার বড় পুত্র নরসিংহ সিংহাসনে বসলে গৃহবিবাদ শুরু হয় এবং তিনি তার প্রিয় ভ্রাতা নরনারায়ণের পক্ষ অবলম্বন করে নরসিংহকে কামতাপুর থেকে বিতাড়িত করেন। নরনারায়ণ কোচ সিংহাসনে বসলে তিনি তার প্রধান সেনাপতি হিসাবে নিযুক্ত হন এবং রাজ অভিষেক হওয়ার সময় রাজকুমার চিলারাই সংগ্রাম সিংহ উপাধিতে ভূষিত হন  এবং রাজ্যের রক্ষণাবেক্ষণ ও সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেন। বিশ্বসিংহের  সময় থেকেই পাশের রাজ্য অহমের সাথে কোচ রাজ্যের তিক্ততার সম্পৰ্ক ছিল। নরনারায়ণের সময়ে যা চরম আকার ধারণ করে, ফলে যুদ্ধ শুরু হয় এবং দীর্ঘবছর যুদ্ধ চলার পর ১৫৬৩ খৃস্টাব্দে  অহম রাজ শোচনীয় ভাবে পরাজিত হন । অহম যুদ্ধে শুক্লধ্বজ বিরাট সামরিক দক্ষতার পরিচয় দেন। এক সময়ে ভরলা নদী অশ্বারোহনে লাফ দিয়ে পার হন এবং চিলের মতো তীব্র গতিতে শত্রু পক্ষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তেন বলে “চিলা রাই” অবিধায় ভুষিত হন। “ফ্রান্সের  ঐতিহাসিক আর্নল্ড টয়েনবির মতে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ তিনজন বীরের নাম তিনি উল্লেখ করেছিলেন, নেপোলিয়ান, ছত্রপতি শিবাজী এবং চিলারাই। এদের মধ্যে তিনি  শ্রেষ্ঠবীর হিসাবে চিলারাই এর নাম উল্লেখ করেছেন।”

Chilarai – Shiva temple – Kamakhya temple

অহম রাজ্য বিজয়ের পর চিলারাই  একে একে পাহাড়ি রাজ্য কাছাড়, মনিপুর, জয়ন্তীয়া, শ্রীহট্ট, ত্রিপুরা জয় করে বঙ্গোপসাগেরর তটভূমি পর্যন্ত অঞ্চল নরনারায়ণের সম্রাজ্য ভুক্ত করেন। নরনারায়ণের সময় কালেই কামতাপুরের উপর কালাপাহাড়ের ঝটিকা আক্রমণে বিরাট ক্ষতি হয়, বহু মন্দির ধংস হয়, এর পরিপ্রেক্ষিতে নরনারায়ণ ও চিলা রায় গৌড় আক্রমণ করেন কিন্তু সফলতা পান নি।   

রাজকুমার চিলারাই এবং মহারাজা নরনারায়ণ দুজনেই শিব ভক্ত ছিলেন। তারা শিব- দুর্গা আরাধনা করার জন্য কুচবিহারে অনেক মন্দির নির্মান করেন।এই সময়ে বৈষ্ণব  ধর্মগুরু শংকর দেব অহম রাজ্য হতে বিতাড়িত হলে চিলা রাই তাকে কামতাপুর  রাজ্যে আশ্রয় দেন ও তার ধর্মমতে দীক্ষিত ও মোহিত হন । মহারাজা নরনারায়ণ  মহাপুরুষ শংকরদেব এর পাণ্ডিত্যে ও গুণে মুগ্ধ হয়ে তাকে রাজসভায় পণ্ডিতের স্থান দেন  এবং কুচবিহার রাজ্যে শ্রী শ্রী মদনমোহন বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করে পূজার ব্যবস্থা করে দেন। সেই সময় থেকেই কুচবিহারে মদনমোহন বিগ্রহের পূজা-অর্চনা প্রচলিত যা আজও বর্তমান। শংকরদেব জাতিতে কায়স্থ ছিলেন অথচ তিনি বৈষ্ণব ধর্মের ধর্মগুরু হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। ব্রাহ্মণরা এই জাতিগত বিদ্বেষ এর বশীভূত হয়ে শংকরদেবকে  হেনস্থা করতে উঠেপড়ে লেগেছিলেন। চিলা রাই এর আশ্রয়ে থাকাকালীন তার অনুমতিক্রমে শংকরদেব “সীতা স্বয়ংবর” নামক নাটক রচনা করেছিলেন। চিলারাই শংকরদেবের জ্ঞাতি ভ্রাতা রাম রায়ের কন্যা কমলা প্রিয়াকে বিয়ে করেছিলেন।

চিলারায়কোট

মহারাজা নরনারায়ণ চিলারাইকে সংকোষ ও ব্রহ্মপুত্র নদীর পূর্ব দিকের সমগ্র অঞ্চল দান করেছিলেন। চিলারাই রায়ডাক নদীর পশ্চিম প্রান্তে ফুলবাড়ীতে (Presently Tufanganj) তার বাসস্থান  গড়ে তুলেছিলেন। দুর্গের আকারে গড়ে তোলা বাসস্থানটি  চিলারায়কোট (Chilaraicourt or Chilarai Garh) নামে পরিচিত। দুর্গের গঠনপ্রণালী ব্রিটিশ পর্যটক রালফ ফিচকে (Ralf Fitch) বিস্মিত করেছিল। দুর্গের  মধ্যে দুইটি মহল ছিল। উত্তর মহলটি  সৈন্যনিবাস, অস্ত্রাগার ও সভাকক্ষ ছিল। দক্ষিণমহলটি ছিল চিলারাই এর অন্দরমহল। দুর্গটি পরিখার দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল। কথিত আছে যে,উত্তর মহল এবং দক্ষিণমহল দুটি দুর্গের মধ্যে  যোগাযোগের জন্য  সুরঙ্গ  ছিল। কয়েক বৎসর পূর্বেও কোটের ধ্বংসাবশেষ অনুমান করা যেতো, বর্তমানে পাশে গড়ে ওঠে নতুন জনবসতির চাপে ধ্বংসস্তূপের অনেক কিছুই প্রায় নিশ্চিহ্ন। শুক্লধ্বজ বারোকোদালী গ্রামে “বড় মহাদেব মন্দির” ও নাককাটি গাছ গ্রামের “ছোট মহাদেব মন্দির “ স্থাপন করেন। এখানে এখনো নিয়মিতভাবে  পুজো ক্রিয়াদি হয়। (See list of Mandir in Coochbehar)

পাটকুমার রঘুদেব নারায়ণ

মহারাজা নরনারায়ণ তার কণিষ্ঠ ভ্রাতা চিলা রাই এর পুত্র  রঘুদেব নারায়ণকে পুত্রবৎ স্নেহ করিতেন এবং অনেক সময় তাকে ক্রোড়ে গ্রহণ করে সিংহাসনে উপবেশন করতেন। বার্ধক্যের প্রারম্ভ পর্যন্ত মহারাজা নরনারায়ণের কোন পুত্র জন্মগ্রহণ না করায় রঘুদেব রাজা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তিনি পাটকুমার বলেও অভিহিত হইতেন। কিন্তু যথাসময়ে রাজকুমার লক্ষ্মীনারায়ণ জন্মগ্রহণ করলে রঘুদেব নারায়ণ এর মহারাজা হওয়ার সম্ভাবনা বিলীন হয়ে যায় এবং কবীন্দ্র পাত্র, গদাধর চাউনিয়া, পুরন্দর লস্কর, কবিরাজ গোপাল চাউনীয়া, গদাই বড়কায়স্ত , শ্রীরাম লস্কর, কনপুর গিরি এদের  কুপরামর্শে পিতার আন্তরিক ইচ্ছা এবং সদুপদেশ অগ্রাহ্য করে রাজধানী পরিত্যাগ করেন এবং মানস নদীর তীরে বড়নগর (Sorbhog, Barpeta, Assam) এর নিকট একটি দুর্গ নির্মাণ করে  সপরিবারে বাস করতে শুরু করিলেন। বর্তমানে অসমের বিজনি, বেলতলা, দরং জেলায় চিলা রাই এর উত্তরপুরুষরা  বসবাস করছেন ।

 ধর্মপ্রাণ চিলারাই অনেক মন্দির স্থাপন এবং সংস্কার করেন।  শাক্ত এবং শৈবপন্থী চিলা রাই বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক  শংকরদেব ছাড়াও মহাকবি অনিরুদ্ধকেও  কামতা রাজ্যসভায় এনে স্থান দিয়েছিলেন। তিনি এবং মহারাজা নর নারায়ণের প্রচেষ্টায়  কামাখ্যা মন্দির ১৫৬৫ খ্রিস্টাব্দের পুনর্গঠন করেন। এই মন্দির নির্মাণের দায়িত্ব দিয়েছিলেন মহৎরাম বৈশ্যকে। জনশ্রুতি আছে যে, চিলারাই না থাকলে কামাখ্যা মন্দিরের পুনর্গঠন কোনভাবেই সম্পন্ন হতো না।

চিলা রাই এর মৃত্যুকাল সম্বন্ধে মতভেদ আছে, কথিত আছে যে, দ্বিতীয়বার গৌড় আক্রমণ কালে এই মহান বীর  (১৪৯২শক) ১৫৭১খৃস্টাব্দে চৈত্র মাসে গঙ্গাতীরে বসন্ত রোগে মৃতু বরণ করেন।

আগামী ২৭ এ ফেব্রুয়ারি, (27th February 2021) শনিবার  বিশ্ববীর চিলারাই এর  ৫১১ তম জন্ম দিবস। এই শুভ দিনে আমরা সকলেই শ্রদ্ধা এবং ভক্তি সহকারে দিনটিকে উদযাপন করব।

জয় মহারাজকুমার শুক্লধবজের জয়।
জয় বিশ্ব মহাবীর চিলা রায়ের জয়।

View All Postsআপনিও পোস্ট করুনAdvertise your Business
Share this:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

36 Views

অ্যাবোরিজিনাল ব্লগটি উত্তরপূর্ব ভারতের ইতিহাস বিশেষত কোচ রাজবংশী কামতার ইতিহাস তুলি ধরার জন্যে বানা হৈচে। ওয়েবসাইট চালনার জন্য পত্তি বছর যে ন্যূনতম খরচা হয় তারজন্যে সগারে হাতে আর্থিক সহানুভুতি আশা করা হবার ধৈরচে। গৃহীত সমস্ত অর্থ সমাজের ভাল্ কাজতে খরচা করা হৈবে।