কুচবিহারের মেজো রাজকন্যা বিশ্ববন্দিত জয়পুরের মহারানী ও রাজমাতার সোনালী জীবন প্রবাহ।

Share this:
Written by – Kumar Mridul Narayan

মহারাজকুমারী আয়েষা (Maharajkumari Ayesha) ওরফে গায়েত্রী দেবী ভারতবর্ষ তথা বিশ্ববাসীর কাছে একটি পরিচিত নাম। বাস্তবের রাজকন্যা হয়ে তিনি রূপকথার রাজকন্যা হয়েছেন। এক কথায় তিনি অনন্যা, অবিস্মরনীয়া, অপরূপা অথচ আদরণীয়া এবং শ্রদ্ধেয়া। অসামন্য সুন্দরী বিশ্ববন্দিতা মহারানী গায়ত্রী দেবী ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারিনী। কুচবিহার রাজবংশের স্বনামখ্যাত রাজকন্যা একদিকে ঐতিহ্যশালী ১৩টি তোপ সম্মানের  অধিকারী, অন্যদিকে রাজপুতনার ১৭টি তোপ সম্মানের অধিকারিনীও ছিলেন  জয়পুরের (Jaipur) মহারানী। রাজ্য কুচবিহারের (Coochbehar) রাজকন্যা গায়ত্রী শুধু কুচবিহার, রাজস্থান, জয়পুরেই নয়, ভারত তথা বিশ্বে মহারানী তথা রাজমাতারূপে খ্যাতি অর্জন করেছেন। তিনি আজও সকলের মনের মনিকোঠায় বিচরণ করেন। 

জন্ম ও নামকরণ

আধুনিক কুচবিহারের শ্রেষ্ঠ মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ (Maharaja Nripendra Narayan) এর দ্বিতীয় পুত্র মহারাজা জিতেন্দ্র নারায়ণ (Maharaja Jitendra Narayan) ও মহারানি ইন্দিরা দেবীর (Maharani Indira Devi) চতুর্থ সন্তান এবং দ্বিতীয়া কন্যা গায়ত্রী দেবীর (Gayatri Devi) জন্ম হয় ১৯১৯খ্রিস্টাব্দের  ২৩শে মে সকাল ৮টায় (লন্ডনের সময়ানুসারে) ইংল্যান্ডে। গায়ত্রী দেবীর আরেক নাম আয়েষা। এই নামের পিছনে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা আছে। আসন্নপ্রসবা অবস্থায় মহারানী ইন্দিরা দেবী রাইডার হ্যাগার্ড-এর (Raider Haggard) উপন্যাস পড়েছিলেন, নাম ছিল “She”. সেই  উপন্যাসের নায়িকা ছিলেন আয়েষা এবং আয়েষা চরিত্রটি মহারানীর খুব ভাল লেগেছিল। তাই তাঁর সংকল্প ছিল যে কন্যা সন্তান হলে তার নাম আয়েষা রাখা হবে। গায়ত্রী দেবীর জন্মানোর পরেই মহারানী তার নাম রাখেন আয়েষা। আবার পারিবারিক রীতি অনুসারে নবজাতিকার কোষ্ঠী রচিত হয় এবং নামকরণের ক্ষেত্রে নামের আদ্যক্ষর “গ” রাখার বিধান দেওয়া হয়। তদনুসারে নাম রাখা হয় গায়ত্রী। মহারাজার ইংরেজ কর্মচারীরা পূর্বোক্ত দুটি নামিই সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারতেন না। মে মাসে জন্মগ্রহণ করেছিলেন জন্য তারা রাজকুমারীর  নাম দিল “Princess May”.

শৈশব থেকেই গায়ত্রী দেবীকে (Gayatri Devi) নিয়ে নানা কৌতুককর গল্প তৈরি হয়েছিল। নিউমোনিয়া (pneumonia) আক্রান্ত অবস্থায় মহারাজা জিতেন্দ্র নারায়ণ যখন লন্ডনের হ্যরোডস্ (Harrods, London)এর উল্টোদিকে বাড়ি ভাড়া নিয়েছিলেন, বছর তিনেকের রাজকুমারী সুযোগ বুঝে রাস্তা পেরিয়ে হেরোডস্এ ঢুকে ম্যানেজার মিস্টার জেফারসনকে (Mr. Jeferson) মা ইন্দিরার মত ভারিক্কি চালে নানা রকম খেলনাপাতির অর্ডার দিত। বিল করতে বলত, “To the accounts of Princess Gayatri Devi of Cooch Behar”. শৈশবকাল থেকেই গায়ত্রী দেবীর এরকম ডানপিটে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের নিদর্শন পাওয়া যায়।

তিনি তার আত্মকথায় (‘A Princess Remembers’) লিখেছেন, তিনি এবং তার ভাই-বোনেরা প্রত্যেকেই কুচবিহারকে খুব ভালোবাসতেন। জীবনের বর্ণময় শৈশবকাল তারা এখানেই কাটিয়েছেন। সাইকেল চড়া, ঘোড়ায় চড়া এবং হাতিতে চড়তে তিনি খুব আনন্দ পেতেন। রোজ সকালে ঘোড়ায় চড়ে পোলো খেলার মাঠে যেতেন, তিনি খুব ভালো পোলো খেলতেন, বর্তমানে এই মাঠ এখন বিমানবন্দর। প্রত্যেক বছর রাজবাড়ী থেকে টাকোয়ামারিতে (Takoamari) বাঘ শিকারে যাওয়া হতো, গায়ত্রী দেবী এবং অন্যান্য ভাই-বোনেরা এবং বিদেশী অতিথিরা  শিকারে যেতেন। ক্যাম্পে থাকাকালীন তারা খুব আনন্দ উপভোগ করতেন। ওই অঞ্চলের জনগণ  রাজপরিবার এবং অতিথিদের শুভেচ্ছা জানাতে আসতেন।গায়ত্রী দেবী গ্রামের জনসাধারণকে খুব ভালোবাসতেন। তার অন্যতম বড় নিদর্শন হল রামপুরে শিকার ক্যাম্পে ফিরে এসে দেখেন একটি ছেলে হেলিকপ্টারের কাছে গিয়ে দেখছে, রাজকুমারী ছেলেটিকে  বললেন উঠবি, মহানন্দে রাজি হল ছেলেটি । ছেলেটির নাম শশীকান্ত বর্মন (Shashikanta Barman)। বাড়ি সিংগীমারী মধুরভাষা। বয়স তখন ২১/২২। তারপর রাজকুমারী তাকে হেলিকপ্টার  করে কুচবিহারে নিয়ে এসে খাইয়ে-দাইয়ে  রামপুরে নামিয়ে দিয়ে গেছেন। শশীকান্তের ছেলে বিমল বর্মন (Bimal Barman) এখন বারোবিশায় বসবাস করেন। এরকম অনেক নিদর্শন এখনো আমাদের কাছেও অজানা কুচবিহারের লোকপ্রিয় রাজকন্যার।

পড়াশুনা

রাজবাড়ীতে রাজকন্যা এবং রাজকুমারদের ছোটবেলায় শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল। একজন ইংরেজ গভর্নেস ছিলেন, তার কাছে ইংরেজি ,ইংরেজি সাহিত্য, ফ্রেঞ্চ বিভিন্ন বিষয়ে তারা জ্ঞান অর্জন করতেন। এরপর ১৯৩৪খ্রিস্টাব্দে গায়ত্রী দেবী এবং ইলা দেবী বাংলা শেখার জন্য শান্তিনিকেতনে ভর্তি হন। ইলা দেবী (Ila Devi) পৃথক বাড়িতে ভাড়া থাকলেও গায়ত্রী হোস্টেলের মেয়েদের সঙ্গে থাকতেন। ওখানকার মেয়েরা রাজকন্যা বলে তাকে সমীহ করলে গায়ত্রী দেবী তা পছন্দ করতেন না। তিনি মেয়েদের সঙ্গে খুব সাদাসিধে এবং সাধারন ভাবে মেলামেশা করতে পছন্দ করতেন। গায়ত্রী দেবী সাইকেলে করে রবীন্দ্রনাথের (Rabindranath Tagore) সঙ্গে দেখা করতে যেতেন এবং রবীন্দ্রনাথ তাকে খুব স্নেহ করতেন ।পন্ডিত জহরলাল নেহেরুর কন্যা ইন্দিরা গান্ধী ও সেখানে তখন পড়তেন।এই সময় থেকেই তাদের মধ্যে যে বিরোধ শুরু হয়েছিল, সেটা জীবনকালে শেষ হয়নি।একজন নেহেরু পরিবার আরেকজন রাজপরিবারের। তার ওপর কে বেশি সুন্দরী, কার আভিজাত্য বেশি মনে হয়, এসব নিয়ে তাদের মধ্যে একটা ঠান্ডা লড়াই লেগেই ছিল তখন থেকে।

 গায়ত্রী দেবীর সাধারণ শিক্ষা আর মেনকা শিল্পবিভাগে শিক্ষালাভ করেছিলেন শান্তিনিকেতনে (Shantiniketan)। সেখানে গায়ত্রী দেবী  এক বছর ছিলেন। ১৯৩৫ খ্রিস্টাদে গায়ত্রী দেবী বোনের সঙ্গে কুচবিহারের ফিরে আসেন। এখানে প্রথম  বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করে ১৯৩৬ সনে সুইজারল্যান্ডে গার্হস্থ্যবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। 

দেশীয় এবং পাশ্চাত্য শিক্ষার গুণে গায়ত্রী দেবী হয়ে ওঠেন স্বকীয়তা এবং প্রগতিশীলতার সমন্বয়ে এক মহীয়সী নারী। তার সৌন্দর্যের কথা তো জগৎবিদিত। তিনি ছিলেন পৃথিবীর দশজন (ভোগ ম্যাগাজিন / Vogue Magazine)  সুন্দরীর একজন। কিন্তু দৈহিক সৌন্দর্যের চেয়ে অনেক বেশি খ্যাতি ছিল তার আন্তরিক সৌন্দর্যের।  সবসময়  ছিমছাম থাকতেন। শাড়ির মধ্যে তার শিপন ছিল খুব পছন্দের। অলংকারের প্রাচুর্য থাকলেও জীবনের শেষ দিকে হালকা গহনা বেশি পছন্দ করতেন। গায়ত্রী দেবীকে প্রথম দেখেই মজেছিলেন জয়পুরের মহারাজা মানসিংহ ( জয়)। লন্ডনে  লেখাপড়া করার সুবাদে জয়পুরের রাজপুত্রের সঙ্গে গায়ত্রী দেবীর পরিচয় ছিল। মানসিং ছিলেন একজন সুপুরুষ এবং রাজোচিত গুণে গুণান্বিত ব্যক্তি। খুব ভালো পোলো খেলতন। তার মধুর ব্যবহারের জন্য তিনি সকলের কাছে প্রিয় ছিলেন। গায়ত্রী দেবীর “ভাইয়া” মহারাজা জগদ্দিপেন্দ্র নারায়ণ (Maharaja Jagaddipendra Narayan) খুব ভালো পোলো খেলতেন। তিনিও জয়পুরের মহারাজার  পোলো টিমের একজন সদস্য ছিলেন। তবে তাদের দুজনেরই এক অদ্ভুত মিল ছিল, দুজনেই মৃত্যুর অন্যতম কারণ ছিল পোলো খেলায় আঘাত পাওয়া। 

বিবাহ

যাইহোক, গায়ত্রী দেবীর সঙ্গে জয়পুরের মহারাজার বিয়ে যেমন কুচবিহারে আলোড়ন তুলেছিল তেমনি জয়পুরে এনেছিল  খুশি ও পরিবর্তনের হাওয়া। জয়পুর দেশীয় রাজ্য হিসেবে কুচবিহারের থেকে আয়তনে বড়, বিত্ত-বৈভব, ঐশ্বর্য  অনেক বেশি। তুলনায় কুচবিহার ছোট রাজ্য হলেও ছিল অনেক আধুনিক এবং প্রগতিশীল। মানসিংহ (Mansingh II) যখন গায়ত্রী দেবীকে  বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন, মেজরাজকুমারী ছিলেন তখন অপ্রাপ্তবয়স্কা। তার উপর মানসিংহ আগে দু দুবার বিয়ে করেছেন, দুইজন স্ত্রী আছে, এমন পাত্রের তৃতীয় পক্ষের স্ত্রী হবেন গায়ত্রী দেবী? রাজকুমার ইন্দ্রজিতেন্দ্র নারায়ণের আপত্তিও ছিল। যাইহোক গায়ত্রী দেবী এবং মানসিংহ একে অপরকে মন দিয়ে বসেছিলেন। সমস্ত বাধাবিঘ্নকে পিছনে ফেলে রাজমাতা ইন্দিরা দেবী জয়ের সঙ্গে গায়ত্রী দেবীর বিয়ের প্রস্তাব অনুমোদন করেন। তিনি ঘোষণা করলেন ১৭ইএপ্রিল ১৯৪০ এ বিয়ে হবে হিন্দুমতে। বিয়ে উপলক্ষে ধুমধাম করে প্রস্তুতিও চলতে লাগলো। আমন্ত্রণপত্র ছাড়া হল। বোম্বে, লন্ডন, ফ্লোরেন্স, চেকোস্লাভিয়া, ফ্রান্স প্রভৃতি স্থানে থেকে জিনিসপত্র কেনাও শুরু হলো। কিন্তু পরিবারের একজনের আকস্মিকভাবে  দুর্ঘটনায় পরলোকগমন করায় বিয়ের তারিখ কিছুটা পিছিয়ে গেল। পরবর্তীতে তারিখ নির্বাচিত হল ৯ই মে , বৃহস্পতিবার  ১৯৪০। 

রাজকন্যার বিবাহ বলে কথা। চারিদিকে সাজোসাজো রব। আনন্দ এবং আয়োজনের কোন সীমা নেই। রাজধানী অপূর্ব সাজে সজ্জিত, শহরের সর্বত্র উৎসবমুখর এর চিহ্ন। পাকা বাড়ি গুলির অভিনব সাজ সজ্জা, শহরজুড়ে সুন্দর সুন্দর তোরন। মহারাজা ভূপ বাহাদুর, মহারাজকুমারগন প্রত্যেকটি আয়োজন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদারকি করেছিলেন। বিয়ের আগের দিন অর্থাৎ ৮ই মে রাজবাড়ীতে নানা ধরনের অনুষ্ঠান করা হয়, যেমন গাত্র-হরিদ্রা, তারপর অধিবাস সময়-ক্ষণ দেখে পালন করা হয়। শ্রী শ্রী মদনমোহন ঠাকুর বাড়িতে যাত্রা সঙ্গীত আয়োজন করা হয় সকলের জন্য ।

৯ই মে কুচবিহার রেল স্টেশনে বরযাত্রীরা বরসহ উপস্থিত হন। মহারাজা জগদ্দিপেন্দ্র নারায়ণ ও তার কর্মচারীরা স্টেশনে উপস্থিত থেকে তাদেরকে অভ্যর্থনা জানান। সকলকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।উল্লেখযোগ্য বরযাত্রীদের মধ্যে ছিলেন ভূপালের নবাব, সিরমুরের অধিপতি, ত্রিপুরার অধিপতি এবং দ্বারভাঙ্গার মহারাজাধিরাজ। সকলকে শোভাযাত্রা করে সার্কিট হাউস থেকে মদনমোহন বাড়ি এবং সেখান থেকে রাজপ্রাসাদে নিয়ে যাওয়া হয়। রাজ্যের তৎকালীন পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট এস.সি. মজুমদার ৪ই মে ১৯৪০ বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে জানিয়েছেন কোন কোন রাস্তায় শোভাযাত্রা পরীক্রমা  করবে। শোভাযাত্রা দেখার জন্য সর্বসাধারণকে সাদর আমন্ত্রণ জানানো হয়। শোভাযাত্রা রাজপ্রাসাদে উপস্থিত হলে যথারীতি উলুধ্বনি, সানাই বাজিয়ে স্বাগত জানানো হয়। এর পর বরকে নিয়ে যাওয়া হয় বিবাহ মন্ডপে। কন্যা সম্প্রদান করেন রাজকুমারীর বড় ভাই মহারাজা জগদীপেন্দ্র নারায়ণ। বিবাহ মন্ত্র হিন্দুশাস্ত্র বিধি বিধান অনুসারে পাঠ করা হয়। এরপর বিবাহ মন্ডপে আনায়ন করা হয় রাজকুমারীকে। মুখচন্দ্রিকাদর্শন, মালাবদল, হাতবদল, বরকে রাজকুমারীর চারদিকে সাতবার ঘোরানো, এভাবেই এক অপূর্ব পরিবেশের মধ্য দিয়ে রাজকুমারীর রূপকথার বিবাহ কার্য সম্পন্ন হয়। ১১ই মে স্পেশাল ট্রেনে বর-কনে এবং বরযাত্রী কুচবিহার রাজ্য ত্যাগ করেন। এ দৃশ্য যেমন আনন্দময় তেমনি করুণ। সকলের চোখে জল, বিদায় মুহূর্ত বর্ণনা করা খুবই কষ্টের।

জয়পুরের রাজমাতা

জয়পুরের তৃতীয় মহারানী হিসেবে গায়ত্রী দেবী এখানকার নিয়ম নীতি, রক্ষণশীল মনোভাব প্রথমদিকে মেনে চললেও পরের দিকে সবটা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তবে জয়ের দ্বিতীয় স্ত্রী তাকে অন্দরমহলের কিছুটা নিয়ম কানুণ শিখিয়ে দিয়েছিলেন। আধুনিক এবং শিক্ষিতা মহারানী গায়ত্রীদেবী  রক্ষণশীল ভাবধারা পরিত্যাগ করে সংস্কারে হাত দেন। এ বিষয়ে তিনি জয়ের প্রচন্ড সহযোগিতা পান। জয়ের সঙ্গে তিনি ঘোড়ায় চড়ে রাজকার্য  পরিচালনায়  যান। আবার খেলাধুলাতেও অংশগ্রহণ করে। এই বিষয়ে জয়ের

 অপর দুই পত্নী তাকে কখনোই ঘৃণা বা অবজ্ঞা করেননি। ধীরে ধীরে তিনি রাজ্যের রাজকার্যশালায় প্রবেশ করেন। রাজ কার্যাবলীর সঙ্গে পরিচিত হন। ধীরে ধীরে শিক্ষা-স্বাস্থ্য, বাসস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, স্থাপত্য, কৃষ্টির বিষয়গুলো চিহ্নিত করেন, উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড গ্রহণ করেন। প্রজাগণ নতুন রানীর কাজের সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং তিনি রাণীমা হিসেবে পরিচিতি হতে থাকেন।

সামাজিক কাজ

গায়ত্রী দেবী রাজস্থানের  নারী শিক্ষা এবং নারী সমাজের উন্নতির সম্পর্কে  খুব সচেতন ছিলেন। সেই উদ্দেশ্য নিয়েই তিনি ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে জয়পুরে নিজের নামাঙ্কিত  “মহারানী গায়ত্রী দেবী বালিকা বিদ্যালয়” (Maharani Gayatri Devi Balika Vidyalaya)স্থাপন করে এক নজির সৃষ্টি করেছিলেন। মেয়েরা যাতে সমাজ জীবনের পিছিয়ে না থেকে, পুরুষদের সাথে সমানতালে এগিয়ে যেতে পারে, নিজেরা নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারে, প্রাচীন কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলে দিয়ে আধুনিক চিন্তাভাবনার শরিক হতে পারে, এই সেবামূলক কাজকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করলেন। ইতিহাস, শিল্প পর্যটন ইত্যাদির উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তার হাত ধরেই রাজস্থান তথা জয়পুর এ পরিবর্তন এসেছে। কুচবিহারের মানুষের জন্য জয়পুরের গায়ত্রী দেবীর প্রাসাদ সব সময় খোলা থাকতো। জয়পুরে কুচবিহারের মানুষ কতজন কতভাবে যে তার কাছে উপকৃত হয়েছেন তার ইয়াত্তা নেই।

ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থায় বিয়ের পরে বাপের বাড়ি থেকে চলে গেলেও বা শ্বশুরবাড়ি জয়পুরের প্রতি ভালোবাসা সত্বেও গায়ত্রী দেবী পিতৃভূমি কুচবিহারকে কখনোই ভোলেননি। ভালোবাসার টানে বারবার তিনি ছুটে আসতেন। জেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল।তার ঠাকুমার নামাঙ্কিত বিদ্যালয় সুনিতী অ্যাক্যাডেমির  ১২৫ বছর বর্ষপূর্তি উৎসব অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি কুচবিহারে আসেন ২০০৪ সালে এবং বিদ্যালয়ের  ছাত্রী, শিক্ষিকা সকলের সঙ্গে তিনি কথা বলেন। বিদ্যালয় আগামীতে  সাফল্যের শিখরে পৌঁছুক এই কামনা করেন। 

কুচবিহার, গোয়ালপাড়া জেলার লোকসঙ্গীত (ভাওইয়া) এ তিনি মুগ্ধ হয়ে যেতেন। সুরেন বসুনিয়া, আব্বাসউদ্দীন, প্রতিমা বড়ুয়া, নজরুল ইসলাম তার প্রিয় শিল্পী ছিলেন। কুচবিহারের আসলেই তিনি গ্রামেগঞ্জে ঘুরে বেড়াতেন। কুচবিহারের মদনমোহন বাড়ি, মধুপুর ধাম, বানেশ্বর মন্দির যেতেন, পূজা দিতেন, এবং  বিশেষ করে মদনমোহন বাড়িতে আরতির সময় প্রতিদিন উপস্থিত থাকতেন। খাগড়াবাড়ির শিবযজ্ঞ অনুষ্ঠানে তিনি কয়েকবার যোগদান করেছেন। নিজের তাগিদ তো বটেই, মহারাজা জগদীপেন্দ্র নারায়ণ পরলোক গমন করার পরে সেই শূন্যতা পূরণ করার জন্য আরো বেশি করে কুচবিহারে আসা শুরু করলেন। নিয়ম করে বছরে একবার দুবার আসতে লাগলেন। কুচবিহারের মানুষ কেমন আছে, এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা কেমন চলছে, সবকিছুরই তিনি খোঁজ রাখতে লাগলেন। রাসমেলাই হোক আর, বইমেলার উদ্বোধন ডাকলেই তিনি চলে আসতেন।

 কুচবিহার রাজপ্রসাদকে কৃষি কলেজ বানানোর জন্য এখানকার একনেতা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এখানকার সংস্কৃতিবান, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন কিছু মানুষ এর বিরোধিতা করেছিলেন। মহারানী রাজনীতিকগত ভাবে এবং ব্যক্তিগতভাবে চেষ্টা করেছিলেন যাতে করে ঐতিহ্যবাহী কুচবিহার রাজবংশের রাজপ্রাসাদ কোনভাবেই ধ্বংস না হয়ে যায়। এই বিষয়ে তাকে যথেষ্ট সহায়তা করেছিলেন কুমার প্রমোদেন্দ্র নারায়ন, ধর্ম নারায়ন বর্মা এবং অনেক বিজ্ঞ ব্যক্তিগণ। অবশেষে অনেক বাধা বিপত্তি পর ভারত সরকার ১৯৮২ সনের২০শে মার্চ The Ancient Monuments and Archaeological Sites and Remains Act, 1958 অনুযায়ী বিজ্ঞপ্তি জারি করে কুচবিহার রাজপ্রাসাদকে জাতীয় মনুমেন্ট  হিসেবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে। প্রসঙ্গত বলে রাখি, রাজবাড়ী ৩৫০বিঘা জমির জায়গায় মাত্র ৫২ বিঘা জমি কেন্দ্রীয় সরকার অধিগ্রহণ করে। রাজপ্রাসাদে একটি মিউজিয়াম চালু করা হয়। কেন্দ্রীয় সরকার রাজবাড়ী অধিগ্রহণ করায় গায়ত্রী দেবী খুবই আনন্দিত হয়েছিলেন। ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেল এটাই ছিল তাঁর বড় সান্তনা। 

আনন্দময়ী ধর্মশালার ভগ্নদশা দেখে তিনি খুবই মর্মাহত মর্মাহত হয়ে পড়েছিলেন। তারপর তিনি ব্যক্তিগতভাবে অর্থ সাহায্য করে আনন্দময়ী ধর্মশালার সংস্কার করেছিলেন। সংস্কারের পর নবগঠিত আনন্দময়ী কর্মশালার উদ্বোধন ২৫ নভেম্বর ২০০২ তাকে দিয়ে করানো হয়েছিল। শুধু তাই নয়, কুচবিহারে আসলেই তিনি বহু মানুষকে সাহায্য করতেন। তিনি দিনহাটা মহকুমার অন্তর্গত বামনহাট বাউশমারী কালীমন্দির এবং কুচবিহার মহকুমা সদর অন্তর্গত চান্দামারী  রাধাগোবিন্দ মন্দির নির্মানকল্পে অর্থ সাহায্য করেছিলেন।

জয়পুরের মহারানী গায়ত্রী দেবীর সঙ্গে  পৃথিবীর বড় বড় রাজপরিবার এবং বিশ্বের তাবড় তাবড় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। তারা ব্যক্তিত্বকে সকলেই সমীহ করত। নিজের পরিবারের লোকজনকে মানুষ যেভাবে চেনে, ইংল্যান্ডের রানীকে তিনি ঠিক সেভাবেই চিনতেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট এর পত্নী জ্যাকলিন কেনেডি একবার দোল উৎসবের সময় ভারত ভ্রমণে  জয়পুর রাজবাড়ীতে  আসেন। জয়পুরের ইতিহাস এবং ঐতিহ্যবাহী বিষয় এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে যান। তাকে বিশাল সংবর্ধনা দেওয়া হয়। আবার সোভিয়েত ইউনিয়নের বুলগানিন ও ক্রুসেভ এসেছিলেন জয়পুরে।

রাজনীতিতে অংশগ্রহন

স্বাধীনতার কিছুদিন পর পর্যন্ত জাতীয় কংগ্রেসের নেতাদের সঙ্গে জয়পুরের মহারাজার সম্পর্ক ভালই ছিল, কিন্তু পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে যখন সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার অগ্রসর  হতে লাগল, সম্পর্কও তখন খারাপ হতে থাকলো। রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী হবার বাসনা না থাকলেও পরিস্থিতির চাপে তাকে রাজনীতিতে আসতে হয়। পন্ডিত চক্রবর্তী রাজা গোপালাচারী অনুরোধে সদ্য জন্ম নেওয়া স্বতন্ত্র পার্টিতে তিনি যোগদান করেন। ১৯৬২সনের সাধারণ নির্বাচনে স্বতন্ত্র দলের প্রার্থী হিসেবে জয়পুর কেন্দ্র থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হন এবং রেকর্ড ভোটে জিতে গিনেস বুকে স্থান করে নেন। তদন্তীন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জে.এফ. কেনেডি (J.F. Kenedy) একজন মহিলা হিসেবে গায়ত্রী দেবীর এই অভূতপূর্ব সাফল্যের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠেছিলেন।

জয়পুরের সাফল্য পেয়ে গায়ত্রী দেবী কুচবিহার লোকসভা উপ নির্বাচনে ১৯৬৩ স্বতন্ত্র দলের প্রার্থী হিসেবে ধর্ম নারায়ণ বর্মাকে দাঁড় করিয়েছিলেন। কিন্তু সাফল্য পাননি। এরপরেও ১৯৬৭ সনে লোকসভা নির্বাচনে তিনি কুচবিহারের বিভিন্ন আসনের স্বতন্ত্র দলের প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বীতা করান, কিন্তু প্রার্থীরা বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি। তিনি নিজে  ১৯৬৭, ১৯৭১স্বতন্ত্র দলের প্রার্থী হিসেবে জয়পুর লোকসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হন। কিন্তু ১৯৭১ সালের সাধারণ নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে জাতীয় কংগ্রেস বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করার পর দেশীয় রাজাদের রাজত্ব ভাতা ও বিশেষ সুযোগ-সুবিধা বিলোপ, ব্যাংক বেসরকারিকরণ  ইত্যাদি  পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি এবং তার দল সরকারের গণতন্ত্র বিরোধী, স্বৈরাচারী ও নীতিবিরোধী পদক্ষেপএর বিরোধিতা করেন। ইন্দিরা গান্ধী (Indira Gndhi) তাকে শায়েস্তা করতে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করলেও গায়ত্রী দেবী কিন্তু কখনোই মাথা নত করেননি। বেআইনিভাবে তার রাজপ্রাসাদে  তল্লাশি চালানো হয়। তাদের অনেক সম্পদ আয়করদপ্তর বাজেয়াপ্ত করে। ১৯৭৫সালে জরুরি অবস্থা চলাকালীন তাকে তিহার জেলে পাঠানো হয়। ১৯৭৬ এ দেশ থেকে জরুরি অবস্থা উঠলে তিনি রাজনীতিতে আর ফেরেননি। এখানেই তাঁর রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। 

অবসর গ্রহণের পর গায়ত্রী দেবী এবং শান্তারামা রাও যুগ্মভাবে ১৯৭৬খ্রিস্টাব্দে “এ‌ প্রিন্সেস রিমেম্বারস্” (A Princess Remembers) নামে গায়ত্রী দেবীর আত্মজীবনী প্রথম আমেরিকায় প্রকাশিত হয়। ভারতে প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৮২খ্রিস্টাব্দে। এই অমূল্য গ্রন্থের পাতায় বড়দা, কুচবিহার, জয়পুর প্রভৃতি স্হানের সুখস্মৃতি মণি মুক্তোর মতো জ্বলজ্বল করছে ।

তার দীর্ঘ ৯০ বছরের জীবনে একাধিক আঘাত এসেছে। আনুমানিক সাড়ে তিন বছর বয়সে তিনি পিতৃহারা হন। তারপর বোন ইলা দেবী, মা ইন্দিরা দেবী, দুই ভাই, তারপর স্বামী জয়ের মৃত্যু (২৪/৬/১৯৭০), রাজপ্রাসাদের সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ এবং সবশেষে তার একমাত্র পুত্র জগৎ সিং (Jagat Singh) এর মৃত্যু (১৯৯৭ সালে) তার জীবনের আশা, চলার উৎসাহ তিনি হারিয়ে ফেললেন। তবে একাধিক আঘাত তাকে দৃঢ়চেতা মানসিকতার অধিকারিনী করে তুলেছিল। এই বিষয়ে তার মা রাজমাতা ইন্দিরা দেবীর যথেষ্ট প্রভাব ছিল। ফ্যাশন দুরন্ত হওয়ার পাঠ ও তিনি পেয়েছিলেন তার মার কাছ থেকে। 

মৃত্যু

২০০৯সালে ইংল্যান্ডে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী জয়পুরে রাজপরিবার তাকে ইংল্যান্ড থেকে জয়পুরে নিয়ে আসেন। কিছুদিন চিকিৎসার পর ২০০৯ সালের ২৯শে জুলাই কুচবিহার এবং জয়পুরের আপামর জনসাধারণকে শোকে ভাসিয়ে দিয়ে চিরদিনের মত ৯০ বছর বয়সে ইহলোক ত্যাগ করলেন এবং আশ্রয় নিলেন কুলদেবতা মা ভবানী এবং মদনমোহনের কোলে।তার মৃত্যুতে কুচবিহার এবং জয়পুরের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে। মহারাজকুমারী, মহারানী ও রাজমাতা  হয়েও অনায়াসে রাজতন্ত্রের আবরণ ছিন্ন করে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় শামিল হয়ে তিনি মানবতার পূজারিনী হিসেবে সেবা করে গেছেন।

প্রকৃতির নিয়মে তিনি আর আজ আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু তিনি সকলের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।তিনি আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকবেন একজন প্রজাদরদী রাজকুমারী ,মহারানী এবং রাজমাতা হিসাবে।কুচবিহার মহারাজাদের মতো তিনি সর্বজন পূজ্য এবং বন্দিত। দুঃখের বিষয় সরকারীভাবে এবং বেসরকারিভাবে কুচবিহার রাজবংশের প্রাচীন ইতিহাসকে ধরে রাখতে বা মহারানী গায়ত্রী দেবীর কর্মকান্ড বা তার উল্লেখযোগ্য অবদান কোন সংগ্রহশালা তৈরি করে সংরক্ষণ করা হয়নি। পিতৃভূমির প্রতি তার অবদান ছিল অনস্বীকার্য ।  অথচ কুচবিহার শহরে আজ পর্যন্ত তার মূর্তি স্থাপন হয়নি। তবে মূর্তি বসুক বা নাই বসুক গায়ত্রী দেবী কুচবিহারের মানুষের মন থেকে মুছে যাবে না। কুচবিহারের মানুষের কাছে গায়ত্রী দেবীর এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবেন। তবে আওয়াজ উঠুক গায়ত্রী দেবীর মূর্তি প্রতিষ্ঠার —একবার নয় বারবার। আমি এই উদ্যোগকে (মূর্তি স্থাপন) সফল করার জন্য সব সময় পাশে থাকব। 


Leave a comment

Enable notifications on latest Posts & updates? Yes >Go to Home Page or Non Amp version Page and \"Allow\"