কুচবিহারের কিছু প্রাচীন দেবদেবীর মন্দির।

দরিয়া বলাই / ঈশ্বর বলরামের ধাম, তুফানগঞ্জ

“বিখ্যাত ছোট অষ্টমী স্নান” (দেবালয়  দর্শন ২৮/১২/২০২১)

তুফানগঞ্জ মহকুমার চিলাখানা মৌজায় ঘোগারকুটি (Ghogarkuti)  গ্রামে গদাধর নদীর (River Gadadhar) পাশেই অবস্থিত এই দেবালয়। আনুমানিক অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি এই দেবালয়টি নির্মিত হয়। মন্দিরটির প্রতিষ্ঠাতা নিয়ে মতভেদ থাকলেও ঐতিহাসিক প্রমাণসাপেক্ষ, তথ্য এবং গ্রন্থের বর্ণনা থেকে জানা যায় মহারাজ উপেন্দ্র নারায়ণের (১৭১৪-১৭৬৩খ্রিষ্টাব্দ ) রাজত্বকালে নাজির দেও শান্ত নারায়ণ এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন এবং পুজো অর্চনার ব্যবস্থাও করেছিলেন। একসময় এই মন্দির দেবত্তর এর অধীনে থাকলেও বর্তমানে স্হানীয় লোকজন কমিটি করে মন্দিরটি পরিচালনা করেন। দরিয়া কথার অর্থ নদী এবং বলাই অর্থে বলরাম। এক কথায় নদীর তীরে বলরাম। বলরাম ঠাকুরের নামানুসারে ওই এলাকার নাম দরিয়া বলাই (Daria Balai) বা বলরামের ধাম।

Balaram Dham, Dariabalai

বলরাম ঠাকুরের দেহত্যাগের কাহিনী

লোকশ্রুতি অনুযায়ী এবং মন্দির প্রাঙ্গনের সামনের অঙ্কিত চিত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, আজ থেকে অনেক অনেক বছর পূর্বে বাবা বলরাম লাঙ্গল দিয়ে জমিতে চাষ করেছিলেন। দীর্ঘক্ষন রোদে মাঠে চাষ করার ফলে তার প্রচন্ড জল তেষ্টা পায়। তৃষ্ণা নিবারণের জন্য তিনি তার স্ত্রীকে হাতের প্যান্টির ইশারায় জল নিয়ে আনতে বলেন। হতভম্ব স্ত্রী ভেবেছিলো তার দিকে বলরাম প্যান্টি তাক করে মারতে আসছেন। ভয়গ্রস্থ হয়ে বলরামের স্ত্রী মুখ ঘুরে দৌড়াতে লাগলেন। স্ত্রীর দৌড়ানো দেখে বলরাম তার পিছু নেন। দৌড়ানোর সময় বলরামের স্ত্রীর হাত থেকে কলস পড়ে যায় ভুচুংমারি (বলরাম আবাস এর নিকটে) এলাকায় ও তৃষ্ণার্ত বলরাম পড়ে যান দরিয়া বালাই এলাকায় এবং সেখানেই বাবা বলরাম দেহত্যাগ করেন। বলরামের হাতের প্যান্টি গিয়ে পড়ে বর্তমান ধুবুরী জেলার ন্যাতা পোতা ঘাটে (এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠদের কথা অনুযায়ী)। সেই থেকেই ন্যাতা পোতাঘাটে অষ্টমী তিথিতে দরিয়া বালাই এর অনুকরণে অষ্টমীর স্নান ও মেলা হয়ে আসছে।

*কৃষির দেবতা  অসীম বলিয়ান বলরাম ঠাকুর মন্দির গৃহে পূর্ব-পশ্চিমে শায়িত আছেন পাকা দেওয়াল এবং চারচালা পশ্চিমমুখী মন্দিরে। আনুমানিক ১৫ হাত বা তাঁর বেশী দীর্ঘদেহী লম্বা পাথরের মূর্তি, পূর্বে মাটির মূর্তি ছিল। হাতে রয়েছে একটি লাঙ্গল ও জোয়াল। পূর্বে  নিত্য পূজা  হত এই দেবতার কিন্তু বর্তমানে আর্থিক দুরবস্থার জন্য বিশেষ তিথিতে শুধুমাত্র পূজা হয়। এছাড়া কোনো পুণ্যার্থীর বিশেষ মানাতে এখানে পুজো হয়। দোলসোয়ারি, অষ্ঠপ্রহর, জন্মষ্টমী, রাধাষ্টমীতে এখানে পূজা হয় স্থানীয় কমিটির তত্ত্বাবধানে। এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে এবং কৃষক সমাজের কাছে এই দেবতা শ্রদ্ধার সঙ্গে পূজিত হয়।

বলরাম ঠাকুরের বিশেষ আকর্ষণ হল চৈত্র মাসে অষ্টমী তিথি উপলক্ষে এখানে  হাজার হাজার পুণ্যার্থী স্নান করে এবং বাবা বলরামের দর্শনে পূর্ণতা লাভ করে। প্রচলিত ছোট অষ্টমীর স্নান বা গদাধরের মেলা  উপলক্ষে এখানে বিরাট মেলা বসে। ভোর থেকেই স্নান শুরু হয়। স্নানাদির পরে বাতাসা, ফুল, জল দিয়ে মন্দিরে পুজো করে ভক্তরা। তারপরে কাদা মাটির ঢেলা করে তুলসী গাছ পুঁতে দেওয়া হয় এবং ফুল, জল দিয়ে বাবা বলরামের উদ্দেশ্যে পুজো দেয়। পূজার পর দই চিড়া খাওয়া হয়। তীর্থযাত্রী দই চিড়া নিয়ে আসে। পাঠা, কবুতর প্রভৃতি উৎসর্গ করেন অনেক তীর্থযাত্রী। তিনদিন ব্যাপী এই মেলা চলে। গদাধরের জলে ডুব দিয়ে সখা সখি পাতানোর ব্যবস্থা আছে। একই বয়সের ছেলে বা মেয়ে ও বয়স্ক ব্যক্তি যৌথভাবে গুয়া পান হাতে নিয়ে ডুব দিয়ে উঠলে ওরা দুজনে সখা ও সখীতে পরিণত হয়। তুলসী তলায় গুয়া ও পান হাতে নিয়ে ভাবি সখা ও সখীরা বসবে। একজন বয়োজ্যেষ্ঠ  ব্যক্তি আম্রপল্লব দিয়ে ওদের মাথায় জল ছিটিয়ে দিবে।তাহলেই ওরা সখা ও সখীতে পরিণত হয় ।এরপরে উভয়ের মধ্যে খাওয়া-দাওয়া হয়। সখা বা সখীর ছেলে মেয়েরা সখা ও সখীকে তাওই বা মাওই  বলে ডাকে।  প্রচুর ভক্ত সমাগম হয় এবং বিশেষ করে অসম থেকে প্রচুর লোক এই মেলায় অংশগ্রহণ করে। লোকমুখে প্রচলিত স্নান পর্বে বাবা বলরামের কাছে কোন কিছু লবন দিয়ে মানত করলে পূর্ণ হয়। হিন্দু,বিশেষ করে কোচ রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষ হত পিতৃপুরুষদের স্বর্গলাভের  আশায়  সংরক্ষিত অস্থি গদাধরের জলে ক্ষেপণ করে। ক্ষৌরকাজের দ্বারা মস্তক-মুণ্ডন করে এবং ব্রাহ্মণের মন্ত্র পাঠের মাধ্যমে তর্পণ করে।

ভক্তদের বাতাসা, উৎসর্গের প্রানিতে ভরে যায় মন্দির। কেউ কেউ দাতব্য দ্রব্য, সোনা, রূপা উপহার্য ইত্যাদি ভক্তি উপহার দেয়। মন্দির কর্তৃপক্ষ নিজের সেবার জন্য কিছু রেখে বাকি জিনিসগুলি বিক্রি করে দেন। পূর্বে এপার ওপার সংযোগের জন্য বাঁশের মাচা তৈরি করা হতো। বর্তমানে নদীর উপর সেতু নির্মিত হওয়ায় যোগাযোগের নতুন মাত্রা পেয়েছে।

এতত এলাকার সত্তোর্রাদ্ধ গজেন বর্মন বলেন, ১৯৬০-৬২ সালের বিধ্বংসী বন্যায় বাবা বলরামের শিলাবিগ্রহ, রুপোর ষাড়, রাধাগোবিন্দের সোনার বিগ্রহ, কাঁসার ঘন্টা চুরি হয়ে যায়।

বর্তমান পুরোহিত যতীন্দ্রনাথ দেবশর্মা, বংশপরম্পরায় এখানে পুজো করে আসছেন। দেউড়ি হিসেবে আছেন মনো বর্মন। মন্দির পরিচালনা কমিটির অন্যতম কর্তা অমল বর্মন বলেন,২২কাঠা জমির উপর এই মন্দির ও প্রাঙ্গন এবং অনেকটাই খোলামেলা জায়গা এবং জায়গাগুলি সংরক্ষণ এবং পরিচর্যার জন্য সরকারি সাহায্যের বিশেষ প্রয়োজন। মন্দির পরিচর্যা, পূজা-অর্চনা এলাকাবাসীর সক্রিয় সহযোগিতায় সম্পন্ন হয়। পুরোহিত এবং দেউড়ির বাৎসরিক যৎসামান্য  বেতন মন্দিরের এবং বিভিন্ন অনুদান থেকে দেওয়া হয়।

ওখানকার অধিবাসী গুমানাথ বর্মনের পৌত্র শিবনাথ বর্মন বলেন,মন্দিরের কিছু জায়গা তার পূর্বপুরুষ পশুনাথ বর্মন দান করেছিলেন।

ঐতিহাসিক স্মৃতি বহন করা  এই মন্দির একপ্রকার অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে। বিশেষ বিশেষ তিথিতে  এর জৌলুস ফিরলেও পাকাপাকিভাবে এর পরিচর্যা এবং সংরক্ষণ না হলে অদূর ভবিষ্যতে এই মন্দির ইতিহাস হয়ে যাবে।

গন্তব্য :-

৩১নং জাতীয় সড়ক ধরে দেওচড়াই মোড় বা টোল গেট থেকে উত্তরে ৬ কিলোমিটার দুরে ঘোগারকুটি মৌজায় এই মন্দির অবস্থিত।

তুফানগঞ্জ শহর থেকে সুইমিং পুলের পাশ দিয়ে সোজা পশ্চিমে অন্ধরান ফুলবাড়ি গ্রাম হয়ে ৭/৮ কিলোমিটার আসলেই এই দেবালয়ে পৌঁছানো যায়।

মুক্তেশ্বর শিবমন্দির, সিঙ্গিজানি

মন্দির দর্শন ০৩/০১/২০২২,সোমবার

প্রাচীন ইতিহাসের স্মৃতিচিহ্ন ফিস ফিস করে পুনরুদ্ধারের হাতছানি দেয়

ইতিহাস সমৃদ্ধ কুচবিহার জেলা়য় প্রাচীন নিদর্শন বা পুরাকীর্তি বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে সন্ধান করলেই মিলবে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। শৈব ভূমি বলে খ্যাত এই ভূখণ্ডে নিশ্চিতভাবে দেবালয় নির্মাণের ক্ষেত্রে শিব মন্দিরের সংখ্যা অন্যান্য মন্দিরের তুলনায় সংখ্যায় অধিক তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

কুচবিহার  সদর থানার ১নং ব্লক মোয়ামারি (Mouamari) অঞ্চলের সিঙ্গিজানি (Singijani) ময়নাগুড়ি, দেওতাপাড়া (Deotapara)  গ্রামে প্রাচীন পুরাকীর্তির অন্যতম নিদর্শন এই মুক্তেশ্বর শিবমন্দির (Mukteshwar Shiva temple)। এই মন্দিরের নির্মাণ শৈলী এবং টেরাকোটা কারুকার্য অনেকটা ধলুয়াবাড়ি সিদ্ধনাথ শিব মন্দিরের সঙ্গে সাদৃশ্য। দক্ষিণমুখি এই শিব মন্দিরে প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে সঠিকভাবে তথ্য জানা না গেলেও আনুমানিক ৫০০বছর আগে বা তার পূর্বে এই মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল। আবার উক্ত এলাকার বাসিন্দা রথীন বর্মন বলেন, মহারাজা কান্তেশ্বর এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মন্দির নির্মাণে ব্যবহৃত বিভিন্ন প্রকারের ইট এবং ছাপ থেকে অনেকটাই অনুমেয় চতুষ্কোণ গম্বুজযুক্ত অসাধারণ নির্মাণশৈলীর এই মন্দির চতুর্দশ শতকে নির্মিত হয়। যদিও রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংস্কারের অভাবে মন্দিরের অনেক অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। বিশেষ করে মন্দিরের উপর অংশে ডুমড়ি গাছ, পাঙুয়া, সোনালু, বটগাছ, পাকড়ি গাছের শেকড় দিয়ে মন্দিরের কাঠামো অনেকটাই খারাপ হয়ে গেছে। মন্দিরের গর্ভগৃহের উপরের অংশে অনেক জায়গায় ফাটল দেখা গেছে । অর্থনৈতিক দৈন্যদশা এবং রক্ষণাবেক্ষণের সঠিক পদক্ষেপ বা পদ্ধতি না জানার ফলে এলাকার লোকজন (বেশিরভাগ রাজবংশী) দেবতুল্য এই মন্দির সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। তবে তারা যথাসাধ্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছেন এটিকে আগলে রাখার। কথা বলে যেটুকু বোঝা গেল  প্রাচীন মন্দিরটিকে রক্ষার্থে কোনরূপ খামতি বা ত্রুটি রাখেননি। তাদের আগ্রহে হয়তো বা এতোটুকু  ঐতিহ্যবাহী সমৃদ্ধশালী সম্পদ এখনও  বর্তমান আছে। বর্তমানে মন্দির পরিচালন কমিটির তত্ত্বাবধানে (দায়িত্বে আছেন রথীন বর্মন, অঙ্গেশ্বর বর্মন, অনিল বর্মন ) এলাকাবাসীর সহযোগিতায় এবং সুপরামর্শে মন্দির সংস্কারের উদ্যোগী হয়েছেন।প্রাচীন এই মন্দিরটিকে পুরনো ধাঁচে বাঁচিয়ে রাখার জন্য অবশ্যই সরকারি সহযোগিতা এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ  অবশ্যই প্রয়োজন।

Mukteshwar Shiva Mandir

মন্দির কমিটির সম্পাদক অঙ্গেশ্বর বর্মন বলেন, এই মন্দিরের নিয়ন্ত্রণাধীন রয়েছে ২২ কাটা জায়গা এবং সঙ্গে রয়েছে একটি বিশাল পুকুর। এতত এলাকাটিকে সুন্দরভাবে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বিশাল অর্থের প্রয়োজন এবং তারা মনে করেন, সরকার উদ্যোগ নিলে বা সরকারি সহযোগিতায় প্রাচীন ইতিহাস বিজড়িত এই মন্দিরটিকে তারা বাঁচিয়ে রাখতে পারবেন। তারা দীর্ঘদিনধরে অতিকষ্টে এটিকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে চলেছেন এবং ভবিষ্যতেও করবেন।

মূল মন্দিরের গর্ভগৃহে রয়েছে শিবলিঙ্গ ও দেবী চণ্ডী। নিত্য পূজা হয় বাবা মহাদেব এবং চন্ডী দেবীর। পূজা করেন স্থানীয় লোকজন। এটাই এখানকার বিশেষত্ব। এছাড়াও রয়েছে একটি নারায়ণ মূর্তি, মূর্তির সঙ্গেই রয়েছে হনুমান, স্বর্গের পরী দুজন, হরিণ্যকুসভ অবতার (বর্তমানে নারায়ণ মূর্তিটি মন্দিরের গর্ভগৃহে থাকেনা,পার্শ্ববর্তী রথীন বর্মনের বাড়িতে এই মূর্তিটি রাখা আছে এবং সেখানেই এর পুজো দেওয়া হয় নিয়মিত)। এছাড়াও এখানকার পুজোর অন্যতম বিশেষত্ব আদিশক্তির জপ করা হয় এবং তান্ত্রিক শক্তির বলিদানের মাধ্যমে আরাধনা করা হয়।  ফাল্গুন মাসে শিবরাত্রি উপলক্ষে দুইদিন মেলা বসে। ভক্তসমাগম হয় প্রচুর। বিভিন্ন জায়গা থেকে পুণ্যার্থীরা এসে বাবা মহাদেবের কাছে মানত করেন এবং মানত সম্পন্ন হলে ভক্তি সহকারে পুজো দেন। এছাড়াও এখানে দুর্গাপূজা, হালযাত্রা, মাশান পূজা, লক্ষ্মী পূজা, মদন কামের বাঁশপূজা, কালী পূজা হয়। বিশেষ বিশেষ তিথিতে এখানে বলি দেওয়া হয়। পাঠা, কবুতর, খাসি এই তিন প্রকার প্রাণী দিয়ে বলি নিবেদন করা হয়।

এছাড়া এতত এলাকা এলাকাবাসীরা বলেন, কুচবিহার রাজবংশের মহারাজারা বিভিন্ন সময়ে এখানে এসে মন্দির সংস্কার এবং পূজা নিবেদন করেছেন। তারা আরো বলেন, মহারাজ নৃপেন্দ্র নারায়ণ এবং মহারাজ জগদ্দীপেন্দ্র নারায়নকে তাদের পূর্বপুরুষেরা এই মন্দিরে আগমন স্বচক্ষে দেখেছিলেন।

 জেলা সদরের সন্নিকটে প্রাচীন এই মন্দিরটি লোকচক্ষুর আড়ালে থাকলেও এটি প্রাচীন সংস্কৃতির ও  অতীত ইতিহাসের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। এগুলোকে সংরক্ষণ করা অবশ্যই প্রয়োজন। এই অমূল্য হেরিটেজ  সম্পদ একবার ধ্বংস হয়ে গেলে পরবর্তী প্রজন্ম এই বিষয়গুলো সম্পর্কে কোন ধারণাই পাবেনা। সরকার বা হেরিটেজ কমিশন প্রাচীন এই মন্দিরটির  উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণের দায়িত্ব নিলে প্রাচীন এই দেবালয়টি রক্ষা পাবে।এ বিষয়ে এলাকাবাসী ও একমত।

মদনমোহন মন্দির, ফলনাপুর ছিটমহল, সাঙ্গারবাড়ি

Madanmohan Mandir, Falnapur Chitmahal, Sangarbari

মন্দির দর্শন ১৩/০১/২০২২

মদনমোহন মন্দির / বাড়ি (Mdanmohan Mandir, Falnapur Chitmahal, Sangarbari) নামটা আমাদের কাছে খুবই সুপরিচিত। এক কথায় আমরা বলে দেই কুচবিহারের প্রাণের ঠাকুরের মদনমোহন এবং তার রাস উৎসব এর কথা। এছাড়াও তুফানগঞ্জ, দিনহাটা, মাথাভাঙ্গা, মেখলিগঞ্জ মহাকুমায় দেবোত্তর ট্রাস্ট এর নিয়ন্ত্রণাধীন মদনমোহন মন্দিরগুলো তুলনামূলকভাবে জনমানষে পরিচিত। মন্দিরময় বর্তমান সংকুচিত কুচবিহার জেলায় এরকমই আরো একটি ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন দ্বিতল বিশিষ্ট মদনমোহন মন্দির রয়েছে এই জেলায় আমাদের অনেকেরই অগোচরে, অনাদরে, অযত্নে, অসংরক্ষিতভাবে। এই দেবগৃহের নির্মাণশৈলী, গঠন, আকৃতি, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ দেখে বোঝা যায় প্রাচীন এই মন্দিরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব কোন অংশে কম নয় । আমাদের এই অঞ্চলে ঐতিহাসিক উপাদানের প্রাচুর্যতা থাকলেও কোনো অজানা কারণে বা অনিহার ফলে কুচবিহারের ইতিহাস অনুসন্ধান আজ পর্যন্ত সঠিকভাবে হয়ে ওঠেনি বলে আমার মনে হয়। তারই ফলশ্রুতি এই মদনমোহন মন্দির। একপ্রকার চরম অবহেলা, উদাসীনতার ফলে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এই প্রাচীন পুরাসম্পদটি।

প্রাচীন এই মন্দিরটির মালিকানা ছিল স্বর্গীয় উপেন্দ্রনাথ রায়ের স্ত্রী স্বর্গীয়া সুরবালা রায়চৌধুরী ইস্টেটের। মন্দিরটির প্রতিষ্ঠাতা কে সঠিকভাবে জানা না গেলেও ওই পরিবারের বর্তমান উত্তরপুরুষ অধীর রায় বলেন, তিনি লোকমুখে এবং পরিবার সূত্রে জেনেছেন এই দ্বিতল দেবালয়টির আনুমানিক বয়স ২৫০-৩০০ বছর হবে এবং তৈরি হয়েছিল কুচবিহার রাজ আমলে (মহারাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি হয়েছিল কিনা অজানা, হতে পারে মহারাজাদের কাছে উপঢৌকন হিসাবে মন্দিরের দায়িত্ব পেয়েছিল এই পরিবারটি)। ছিটমহল এলাকা হওয়ায় বিভিন্ন প্রান্তের মানুষজন এই মন্দিরটিকে দর্শন করতে পারেননি। ২০১৫ সালের পর বর্তমানে এলাকাটি ভারতের ছিটের অন্তর্ভুক্ত।

পূর্বে দ্বিতল মন্দিরটির উপরতলায় পুজা হত মদন মোহনের বিগ্রহ,রাধা কৃষ্ণ ও শালগ্রাম শিলার। নিচতলায় বাৎসরিক দুর্গাপূজা হত। অসমীয়া ব্রাহ্মণ উমেষ দেব শর্মা এখানে পুজো করতেন । এছাড়াও এখানে বিভিন্ন তিথিতে দোলযাত্রা, রাধাষ্টমী, জন্মাষ্টমীতে পূজা অর্চনা হত এবং বর্তমান সময়ে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় এই উৎসব গুলি হয়।

এই মন্দিরের বর্তমান অংশীদার পঙ্কজ রায় এবং অধীর রায় চাকরি সূত্রে ছয় সাত বছর আগে অন্যত্র চলে যাওয়ায় ওই এলাকার বাসিন্দা স্বর্গীয় নিকুঞ্জ বর্মনের পুত্রবধূ মানবী বর্মন নিয়মিত পূজা করে আসছেন রাধাকৃষ্ণের। যদিও মন্দির অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত সুরক্ষা না থাকায় সুধীর রায় মদন মোহনের বিগ্রহ গুলি তার বর্তমান বাসস্থানের নিয়ে এসেছেন এবং সেখানে তিনি নিয়মিত পুজো দেন।

মন্দিরের এই হতশ্রী চেহারা এবং ভগ্নাবশেষ খুবই বেদনাদায়ক। বট গাছের শিকড় মন্দিরটিকে নষ্ট করে দিচ্ছে। যথেচ্ছ ফাটল ধরেছে মন্দিরের উপরের অংশে। মন্দিরের পাঁচটি চূড়ার মধ্যে চারটি নষ্ট হয়ে গেছে এবং একটি আগাছায় ঢেকে গেছে। এখানকার বাসিন্দা কেউ মন্দিরের চূড়া মাথাভাঙ্গা শহর থেকে দেখা যেত, আবার অনেকে বলেন গোসাইরহাট বাজার থেকে দেখা যেত। অনুমান করা যায়, ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের বিধ্বংসী ভূমিকম্প এই মন্দিরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। মূলমন্দিরের উপরে উঠার সামনের সিঁড়ি একেবারে ধ্বংস প্রাপ্ত এবং ধ্বংসাবশেষের চিহ্ন এখনো বর্তমান। শুধু তাই নয় ওই ভূমিকম্পের ফলে মন্দিরের অনেকটা অংশই নিচে ডেবে যায়। বর্তমানে উপরে উঠার জন্য টেম্পোরারি ভাবে বাসের সিঁড়ি ব্যবহার করা হচ্ছে। নিচের ঘরগুলি রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যবহার না করার ফলে একপ্রকার ধ্বংসের দিকে।

পশ্চিমমুখী এই মন্দিরের ডানদিকে রয়েছে একটি প্রকাণ্ড ইদারা। এখানে ছিলো অনেক প্রাচীন বকফুল, বেল গাছ। জমির পরিমাণ রয়েছে ১০কাঠা। অনেক ভক্ত প্রাণ মানুষ এখানে ছুটে আসেন পুজো দিতে এবং দর্শন করতে।কিন্তু এর ইতিহাস এবং ঐতিহ্য সম্পর্কে অনেকেই ওয়াকিবহাল নন। যার ফলে ইতিহাস সমৃদ্ধ এই মন্দির আজও আমাদের লোকচক্ষুর আড়ালে। তিলে তিলে তিলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এর কাহিনী। উন্মোচন হোক এর সঠিক ইতিহাস এবং জনমানষে প্রকাশ হোক রাজকাহিনীর আরো একটি গৌরব ও ঐতিহ্য।

বড়বাড়ি শিব মন্দির / রায় বসুনিয়া পরিবারের বড়বাড়ির দ্বিতীয় জল্পেশ মন্দির

Borobari Shiva Mandir – Roy Basunia Family

মন্দির দর্শন ১৭/০১/২০২২

শৈবভূমি কুচবিহার জেলার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে বহু প্রাচীন শিব মন্দির। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বা বেসরকারি তত্ত্বাবধানে এই মন্দিরগুলির পূজা অর্চনা হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। আবার কিছু কিছু প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী মন্দির রয়েছে একেবারে লোকচক্ষুর আড়ালে। অনুসন্ধান সাপেক্ষে এরকম একটি প্রাচীন মন্দিরের প্রতি অবজ্ঞা এবং উদাসীনতা দেখে যারপরনাই মর্মাহত হলাম। শতবর্ষ প্রাচীন স্বর্গীয় ধৈর্য্য নারায়ন রায় বসুনিয়া, স্বর্গীয় ধর্ম নারায়ন রায় বসুনিয়া, স্বর্গীয় দ্বারিকা নারায়ন রায় বসুনিয়া, স্বর্গীয় ধর্ম নারায়ন রায় বসুনিয়া, স্বর্গীয় খগেন্দ্র নাথ রায় বসুনিয়া পরিবারের জল্পেশ মন্দিরের আদলে নির্মিত শিব মন্দির শুধু একটি ইতিহাস নয়, “জীবন্ত ইতিহাস”। এই মন্দির সুদূর অতীতকে আমাদের চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ফুটে তোলে। এরকম একটি অজ্ঞাত এবং বিস্তৃত প্রায় “জীবন্ত ইতিহাস” জেলার পুরাকীর্তির একটি অন্যতম অমূল্য সম্পদ।যথাযথ প্রচার এবং সংস্কার এর অভাবে এই অমূল্য সম্পদটি যেমন লোকচক্ষুর আড়ালে ঠিক তেমনি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধ্বংসের এর দিকে এগিয়ে চলেছে।

কুচবিহার রাজআমলে জোতদার ভুক্ত এই রায় বসুনিয়া পরিবারটির অনেক নামডাক ছিল। বিশাল ভূসম্পত্তির অধিকারী ছিলেন এই পরিবারটি। ভারতভুক্তি এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভূমি সংস্কার আইনের ফলে এই পরিবারের অনেক সম্পত্তি ভেস্ট হয়ে যায়। ক্রমান্বয়ে আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে যায় এই পরিবারটি। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে গেলেও তারা সাধ্যমত এই মন্দিরের সংস্কার করেছিলেন এবং শিব মন্দিরে পূজা অর্চনা করেছিলেন ইতিপূর্বে। বর্তমান পরিস্থিতিতে মন্দিরের সংস্কার তাদের সাধ্যের বাইরে চলে যাওয়ায় তারাও চাইছেন সরকারি উদ্যোগে এই মন্দিরটির সংস্কার হোক। রক্ষা পাক ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন ইতিহাস।

বর্তমানে মন্দিরটিতে শুধুমাত্র শিব চতুর্দশীতে শিব বিগ্রহটি নিয়ে আসা হয়, সঙ্গে নিয়ে আসা হয় গণেশ এবং ষাড়ের বিগ্রহ। প্রচুর ভক্তসমাগম হয় ওই দিনে। বাকি দিনগুলোতে বিগ্রহগুলির নিত্য পূজা হয় বাড়ির মধ্যে এবং পূজা দেন বাড়ির লোকজন। পূর্বে এখানে নলবাড়ির অসমীয়া ব্রাহ্মণ উৎসবদেব শর্মা বংশপরম্পরায় পুজো দিয়ে এসেছেন। একটি আকস্মিক দুর্ঘটনা হয়ে যাওয়ার ফলে শর্মা পরিবারটি এখানে পূজা করা বন্ধ করে দেন।

দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণমুখী এই মন্দিরটিতে সংস্কার না হওয়ার ফলে মন্দিরটির অবস্থা প্রায় ভগ্নপ্রায়। বাইরের এবং ভেতরের দেয়াল থেকে (একবার সংস্কার করলেও ) প্লাস্টার খুলে পড়ছে। মন্দিরের চূড়ায় ত্রিশূল থাকলেও তা আগাছায় ঢেকে যাচ্ছে। মন্দিরের অভ্যন্তরে মেঝের অবস্থা খুবই দৈন্যদশা। প্রয়োজনীয় সুরক্ষা না থাকায় মন্দিরের বিগ্রহ গুলি বাড়িতে রাখা আছে।

রায় বসুনিয়া পরিবারের বর্তমান ষাটোর্ধ্ব সদস্য গৌতম রায় বসুনিয়া বলেন, তিনি শুনেছেন বহুকাল পূর্বে থেকে তাদের বাড়িতে তাদের পূর্বপুরুষেরা শিবের আরাধনা করত মহা ধুমধাম করে। তার স্বর্গীয়া ঠাকুমা বিমলাবালা রায় বসুনিয়া (স্বর্গীয় গিরীন্দ্র প্রসাদ রায় বসুনিয়ার স্ত্রী) আজ থেকে শতবর্ষ পূর্বে জল্পেশ মন্দিরের আদলে এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন এবং মন্দির নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে কাশীধাম থেকে শিবের বিগ্রহ নিয়ে এসে প্রতিষ্ঠা করেন। সঙ্গে নিয়ে আসেন গণেশ এবং ষাঁড়ের বিগ্রহ। ধুমধাম করে শিবরাত্রিতে পুজো হত সেই সময়। চার প্রহরে পুজা হত শিবরাত্রিতে। চতুর্থ প্রহরে অন্নভোগ দেওয়া হতো।শিবরাত্রি পরের দিন পাশের কালীমন্দিরে পাঁঠা বলে দিতেন। যদিও বর্তমানে এই পরিবারে বলি প্রথা বন্ধ হয়ে গেছে।

অতীতের স্মৃতিকে আলোকপাত করতে করতে তিনি আরো বলেন কুচবিহার রাজদরবারে যথেষ্ট সম্মান পেতেন তার পূর্বপুরুষরা। “পুন্যাহ” উৎসবের (আর্থিক বছরের শেষে, সাধারণত মে মাসে) সময় মহারাজাদের উপস্থিতিতে রাজদরবারে তার পূর্ব পুরুষেরা তাদের জোতের খাজনা বা নজর দিতেন। খুব ভালো সম্পর্ক ছিল রাজবাড়ী সঙ্গে তাদের পরিবারের। ঘোড়সওয়ার করে তাড়া রাজবাড়ীতে উপস্থিত হতেন এবং বিভিন্ন সময়ে দরবার থেকে তারা উপঢৌকন পেতেন।

ওই অঞ্চলের প্রভাবশালী রায় বসুনিয়া পরিবারটির সুখ্যাতি এখনো লোকমুখে প্রচলিত। ওই পরিবারের আরেকজন বর্তমান সদস্য জগৎ জীবন রায় বসুনিয়া বলেন, পূর্বে তাদের বাড়িতে অনেক হাতি ছিল, অনেক কর্মচারী ছিল, বাড়ি পাহাড়া দেওয়ার জন্য অনেক দারোয়ান ছিল, ব্রাহ্মণদের পাকাপাকিভাবে বাসস্থানের জন্য বাড়ি নির্মাণ করে দিয়েছিল তার পূর্ব পুরুষেরা, বিঘার পর বিঘা তাদের পুকুর ছিল। যদিও ভূমি সংস্কার আইনের ফলে এগুলি তাদের পরিবারের হাতছাড়া হয়ে যায়।

ক্ষেতী ফুলবাড়ী ( Kheti Fulbari) অঞ্চলের এই পরিবারটি ক্রমান্বয়ে বড় হতে থাকে। বর্তমান উত্তরাধিকারীগণ তাদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটিতে বসবাস করছেন। জমি জায়গা গুলির তাদের মধ্যে শরিকি ভাগ হয়ে যায়। শরিকি ভাগ হয়ে গেলেও তাদের প্রতিষ্ঠিত এই শিব মন্দির সম্পর্কে তারা খুবই সচেতন এবং আগ্রহী। এখনো তারা নিয়মনিষ্ঠা করে বাড়িতেই পূজা অর্চনা করেন ।

উল্লেখ্য যে, এই পরিবারের স্বর্গীয় তারকেশ্বর রায় বসুনিয়ার কন্যা রাধারানী রায় বসুনিয়া (বর্মন) কুচবিহারের স্বনামধন্য ব্যক্তি, বিশিষ্ট আইনজীবী রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার প্রাক্তন সদস্য স্বর্গীয় প্রসেনজিৎ বর্মন এর সহধর্মীনি ছিলেন।

শতবর্ষ প্রাচীন শিব মন্দিরকে সরকারি বা বেসরকারি ভাবে বাঁচিয়ে রাখতে হলে জেলার পর্যটন মানচিত্রে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে। নতুবা এই প্রাচীন পুরাসম্পদটি লোকচক্ষুর আড়াল থেকে অদৃশ্য হয়ে যাবে।

মন্দির দর্শনে আমার সঙ্গে ছিলেন প্রিয় ভাই আবির ঘোষ এবং ভাই সৌরভ বর্মন।

Leave a Comment

Your email address will not be published.