rajabhatkhawa dooars tour

রাজাভাতখাওয়া ইতিহাস ও প্রকৃতির মিশেল। Rajabhatkhawa History

ইতিহাস ও প্রকৃতির মিশেল – রাজাভাতখাওয়া / Rajabhatkhawa History and Natural Beauty 

Mridul Narayan
Kumar Mridul Narayan

পাহাড়, জঙ্গল, নদী, পশু, পাখি চেনা-অচেনা গাছপালার ডুয়ার্সে  একবার গেলে বারবার যেতে ইচ্ছে করবে। নদী, অরণ্যে এবং সবুজ চা বাগানের গালিচার  মাঝে মেচ (Mech) , রাভা (Rabha) , ওরাও (Oraon) , টোটোদের (Toto) বাসের দৃশ্য ভ্রমনপ্রিয় মানুষজনকে  বারবার আকৃষ্ট করে। কপাল ভালো থাকলে দেখা যায় রাস্তার উপর বাঁদরদের জিমন্যাস্টিক এর মহড়া। গাড়ি থেকে হাতি, চিতাবাঘের চলাফেরার দৃশ্য ভারি মজার। কার সাফারি বা এলিফ্যান্ট রাইডিং এর মাধ্যমে অর্জন করা যেতে পারে ঘন জঙ্গল  ভ্রমণের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। গভীর অরণ্যে বনবাংলোতে রাত্রিবাসের অনুভূতি দারুন। পাহাড় , প্রকৃতি, নদী, চা বাগান  জঙ্গলের মিশেল ডুয়ার্স (Dooars) বারবার আপনাকে স্বাগত জানায়। আলিপুরদুয়ার (Alipurduar) থেকে মাত্র ১৫কিলোমিটার দূরেই উত্তরের স্বর্গ বক্সাদুয়ার এর ইতিহাস বিজড়িত জায়গা রাজাভাতখাওয়া। রাজাভাতখাওয়া ইতিহাস ও প্রকৃতির মিশেল (Rajabhatkhawa History with Natural beauty)। রাজাভাতখাওয়া নামটা আমাদের কাছে পরিচিত হলেও, রাজাভাতখাওয়া নামকরণের ইতিহাস সম্পর্কে আমরা খুব বেশি অবগত নই। চলুন একটু পড়ে নেই এর নামকরণের ইতিহাস –

রাজাভাতখাওয়া নামকরণের ইতিহাস / Rajabhatkhawa History 

রাজাভাতখাওয়া (Rajabhatkhawa) নামটি কুচবিহাররাজ এবং ভোটানরাজের সম্পর্কের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে ত্রয়োদশ  মহারাজা হিসেবে সিংহাসনে বসেন মহারাজ ধৈর্যেন্দ্র নারায়ণ (Maharaja Dhairjendra Narayan)। সিংহাসনে বসার পরই বক্সা সংলগ্ন সমতল ভূ-ভাগ নিয়ে ভুটান রাজার সঙ্গে তার বিরোধ শুরু হয়।  এই বিরোধ মহারাজ উপেন্দ্র নারায়ণের (Maharaja Upendra Narayan) সময়ও ছিল। আলিপুরদুয়ার সংলগ্ন চেচাখাতায় (Chechakhata) কুচবিহার রাজের সঙ্গে ভুটান রাজের বার্ষিক ভোজসভার আয়োজন হতো। সেই ভোজসভায় ভুটান সেনাপতি পেনশু তোমা (Pensu Tome) মহারাজ ধৈর্যেন্দ্র নারায়ণকে, তার ভাই দেওয়ান সুরেন্দ্রনারায়ণকে (Dewan Surendra Narayan) বন্দী করেন ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে। বন্দী মহারাজাকে প্রথমে বক্সা (Buxa) এলাকায় যে জায়গায় আটক করে রাখা হয়েছিল তার বর্তমান নাম দমনপুর (Damanpur) । দমন অর্থাৎ আটক পুর অর্থাৎ এলাকা। মহারাজাকে আটক করে যে এলাকায় রাখা হয়েছিল এলাকার নাম বর্তমান দমনপুর এবং পরে ভুটানের রাজধানী  পুনাখাতে (Punakha) নিয়ে গিয়ে মহারাজাকে  গৃহবন্দি করে রাখা হয়।

স্থায়ী মহারাজা না থাকার ফলে কুচবিহারে ভুটিয়া প্রভাব পড়তে বৃদ্ধি হতে থাকে এবং রাজ্যে শুরু হয় চরম বিশৃঙ্খলা।মহারাজের অবর্তমানে ভুটিয়া সেনাপতি মৃত দেওয়ান দেও রামনারায়ণ  পুত্র বীজেন্দ্রনারায়ণকে (Bijendra Narayan) রাজা করেন  এবং তাকে কুচবিহারে না রেখে চেচাখাতায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ভুটিয়ারা গীতালদহ, ফালাকাটা, লক্ষ্মীমপুর, ডালিমকোট , পাগলাহাট দখল করে নেয়।সেইসঙ্গে রাজ্যের উপর দখলদারি প্রতিষ্ঠা করতে এবং রাজধানীকে সুরক্ষিত রাখতে গীতালদহ, বালাডাঙ্গা, মোওয়ামারী, লক্ষ্মীপুরে জায়গায় জায়গায় তৈরি করেন ভুটানি ছাউনী। এমনকি রাজবাড়ীকে সুরক্ষিত রাখার জন্য রাজবাড়ীর চারদিকে বিষাক্ত খোঁটা পুতিয়ে রাখা হয়েছিল।

ভুটান সেনাপতি পেনশু তোমা ভুটানে মহারাজা দেবরাজকে (Maharaja Devraj) সকল বিষয়ে অবগত করার জন্য ফিরে গেলেও  মহারাজার ভাগনে জিম্পেকে দেখভালের জন্য রেখে গেলেন। তার অনুমতি ছাড়া কুচবিহার রাজ্য কোন কিছুই সম্ভব হতো না। এমত অবস্থায় রাজপরিবার মহারাজাকে উদ্ধার করার জন্য নাজিরদেও খগেন্দ্র নারায়ণ এর নেতৃত্বে  শরণাপন্ন হয় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মহারাজকে উদ্ধারের বিষয়টি প্রথমে আগ্রহ দেখায়নি।কিন্তু ব্যবসায়ীক ও বাণিজ্যিক স্বার্থে, রেলপথ নির্মাণের কথা ভেবে কুচবিহার ও ভুটান বিরোধে  কোম্পানি কুচবিহার রাজ্যের পক্ষ নেয়। কোম্পানি ভুটানে ব্যবসা করার জন্য এবং অরণ্য সম্পদ দখল করার জন্য এবং রেলপথ নির্মাণের জন্য পর্যাপ্ত কাঠের প্রয়োজন এবং বক্সা অঞ্চলের কাঠ এই নির্মাণ কার্যের জন্য একদম উপযুক্ত।

rajabhatkhawa history
Rajabhatkhawa – Historical Place

১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দের ৫ এপ্রিল মহারাজা এবং দেওয়ানদেওকে উদ্ধারের জন্য কোম্পানির সঙ্গে কুচবিহার রাজ্যের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় । চুক্তি স্বাক্ষর এর পর ১৭৭৪খ্রিস্টাব্দে কুচবিহার ও ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর যৌথ সেনাবাহিনী ক্যাপ্টেন জোন্স এর  নেতৃত্বে কুচবিহারের বিভিন্ন ভুটানি ছাউনি ভেঙে দেয় এবং রাজধানীকে ভুটিয়া দখলমুক্ত করে। মহারাজা দেবরাজের ভাগ্নে জিম্পে (Jimpe)  যুদ্ধে নিহত হন। যুদ্ধের পর রংপুরের ক্যাপ্টেন মিঃ পারলিং ভুটান রাজাকে এই মর্মে চিঠি দেন যে, অতি দ্রুত মহারাজা এবং তার সঙ্গীদের মুক্তি না দিলে কোম্পানি ভুটানের রাজধানী পুনাখা দখল করে নেবে। সমতল ভাগ থেকে বিতাড়িত হয়ে ভুটান রাজা তিব্বতীয় কর্তৃপক্ষ তিশু লামার মাধ্যমে কোম্পানির সঙ্গে সন্ধি করতে বাধ্য হন।

১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দের ২৫শে এপ্রিল ভুটান এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সন্ধির  ৩নং ধারা অনুসারে মহারাজা ধৈর্য্যেন্দ্র নারায়ণ  এবং দেওয়ানদেও মুক্ত হন। ভুটান থেকে মুক্তি পেয়ে মহারাজা ধৈর্য্যেন্দ্র নারায়ণ এবং তার সঙ্গীরা বক্সাদুয়ার এর পথে অগ্রসর হন। রাজপরিবার এবং রাজকর্মচারীরাও মহারাজার মুক্তির খবর পেয়ে মহারাজাকে অভ্যর্থনা দেওয়ার জন্য বক্সার দিকে অগ্রসর হন। বন্দী অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়ে স্বদেশে চেচাখাতার সন্নিকটে প্রথম অন্নগ্রহণ করেছিলেন।কূচবিহাররাজের অন্নগ্রহণের পর থেকে ওই জায়গার নাম হয় “রাজাভাতখাওয়া” (Rajabhatkhawa)। ঐতিহাসিক এই জনপদের নামকরণ নিয়ে দ্বিমত নেই।

Natural Beauty – Rajabhatkhawa / প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য – রাজাভাতখাওয়া

সভ্যতার বিকাশে রাজাভাতখাওয়া (Rajabhatkhawa) আজ আলিপুরদুয়ার জেলায় (Alipurduar district) পর্যটকদের  একটি দর্শনীয় স্থান। ইতিহাসের স্পন্দন কিছুতো লক্ষ্য করা যায়।রাজাভাতখাওয়া সন্নিকটে চেচাখাতার জঙ্গলে অনুসন্ধান করলে হয়তো অনেক কিছুই পাওয়া যাবে? আমরা পাহাড়-জঙ্গল, চা বাগান, নদী-নালা নিয়ে খুশি। ইতিহাস খুঁজতে কেন যাব? যাই হোক আরণ্যক পরিবেশে ছোট্ট জনপদ রাজাভাতখাওয়া গেলেই দেখা মিলবে Nature Interpretation Centre / প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ  কেন্দ্র। বন ও প্রাণী উদ্ধার এবং চিকিৎসাকেন্দ্র, অর্কিডারিয়াম। গভীর অরণ্যের অনেক অজানা তথ্য জানার জন্য আসতেই হবে এই প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ  কেন্দ্রে। একটু উত্তরে গেলেই দেখা যাবে মোহময়ী রাজাভাতখাওয়া রেল স্টেশন, ডাকঘর, সঙ্গে প্রকৃতির বৈচিত্র রূপ। ইতিহাস এবং প্রকৃতির সাক্ষ বহনকারী  আরণ্যক এই জনপদটি বরাবরই  ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের প্রিয়স্থান ।

Leave a Comment

Your email address will not be published.