pallibhandar gajendranarayan estate chilaray garh

ঐতিহাসিক রাজসম্পদ বেদখল – তুফানগঞ্জ। Pallibhandar, Gajendranarayan Estate, Chilaray Garh of Tufanganj

তুফানগঞ্জের ঐতিহাসিক রাজসম্পদ বেদখল / Dispossessed Royal treasure of Tufanganj

Mridul Narayan
Kumar Mridul Narayan

আমরা যদি ঐতিহাসিক গুরুত্বের দিক থেকে বিচার করি বরাবরই তুফানগঞ্জ মহকুমা দীর্ঘ ৪৫০বছরের রাজআমলে বিশেষ গুরুত্ব পেত প্রশাসনিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে। তুফানগঞ্জের চিলারায় গড় (Chilaray Garh of Tufanganj) যেমন প্রশাসনিক সুবিধার জন্য নির্মান করা হয়েছিল তেমনি মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণের আমলে দি পল্লীভান্ডার লিমিটেড কোম্পানি (The Pallibhandar Limited Company, Tufanganj) গঠন করা হয়েছিল অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য। অন্যদিকে সামাজিক কল্যাণের জন্য কুমার গজেন্দ্র নারায়ণ এস্টেট (Kumar Gajendranarayan Estate, Tufanganj) ছিল তুফানগঞ্জের আর এক ঐতিহাসিক স্থাপনা। 

 নদীমাতৃক এই মহাকুমা রাজ্যের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত হওয়ায় এবং বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল হাওয়ায় রাজ্যের উন্নতির ক্ষেত্রে,সামরিক ক্ষেত্রে,অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে  বিশেষ ভূমিকা নিত প্রাচীন এই মহাকুমা। এই মহাকুমাতেই আছে রাজসরকারের (বর্তমান দেবত্র ট্রাস্ট বোর্ড নিয়ন্ত্রণাধীন ) সর্বাধিক ৬টি মন্দির, রাজধানী শহর বাদ দিলে।প্রজা কল্যাণের স্বার্থে বরাবরই মহারাজাদের তীক্ষ্ণ নজর ছিল এই এলাকায়। প্রজাবৎসল মহারাজারা এলাকার হিতার্থে বরাবরই নানা উন্নয়নমূলক কাজও করেছিলেন। তৎকালীন কামরূপ-কামতা- কুচবিহার রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজবংশী (State Census Report) মানুষের সঙ্গে সঙ্গে  নন-রাজবংশী মানুষজনও এখানে বসবাস করেছিলেন এবং রাজ্যের উন্নয়নের ক্ষেত্রে তারাও ভূমিকা পালন করেছিলেন।

এই মহকুমায় বিভিন্ন সময়ে কুচবিহারের বাহিরে থেকে আগত মানুষজনকে  মহারাজারা ও এখানকার মানুষজন  আপন করে নিয়েছিলেন।মহারাজাদের এই কৃতজ্ঞতা আজ কিছু সংখ্যক স্বার্থান্বেষী ব্যক্তির লালশায় চরম ক্ষোভের আকার সৃষ্টি করেছে। বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে এক গোষ্ঠীর সঙ্গে অপর গোষ্ঠীর।একে অপরকে সন্দেহের চোখে দেখে।নষ্ট হচ্ছে এখানকার সংস্কৃতি ।রাজ আমলের প্রাচীন এই মহাকুমায়  রাজ সম্পদ আজ বেদখল হয়ে আছে। চিলা রায়ের গড়, পল্লী ভান্ডার কোম্পানি, গজেন্দ্র নারায়ন সাহেবের ইস্টেট এর প্রায় ৮০/৯০ শতাংশ পরিমাণ সম্পত্তি আজ রাজার নেই।কোথায় গেল এত  সম্পত্তি,কারা দখল করল, কেন দখল করল, কবে দখল করল, কিভাবে দখল করল, রাজ সম্পত্তি দখল করা যদি রোগ বা নেশা হয়  এর প্রতিকার করা প্রয়োজন। প্রকৃত অর্থেই যারা মহারাজাকে ভালোবাসে, এখানকার সংস্কৃতিকে ভালোবাসে তারা এই কাজ কোনদিন করবে না।মহারাজাদের প্রকৃত শিক্ষা তার প্রজাদের বা তার উত্তরসূরিদের এই কাজ করতে একশোবার ভাববে। তাহলে তারা কারা ? উত্তর চাই..

১) চিলারায়ের গড় (কোর্ট) / Chilaray Garh

তুফানগঞ্জ মহকুমার অন্যতম ৫০০শত বছরের প্রাচীন নিদর্শন‌ অন্দরান ফুলবাড়ীর চিলা রায়ের গড়। মহারাজ নরনারায়ণের ভ্রাতা, দ্রোর্দণ্ডপ্রতাপ সেনাপতি শুক্লধজ/ চিলারায় এই দুর্গটি নির্মাণ করেছিলেন ষোড়শ শতাব্দীতে। মূলত আসাম রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা, নিজস্ব পরিবার-পরিজনকে শত্রুপক্ষের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য নিরাপদ দূরত্বে দুটি দুর্গ নির্মাণ করেন। রায়ডাক নদী পাশে থাকায় সামরিক দিক  থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই আবাসস্থলে থাকতেন । তৎকালীন কামতা অঞ্চলে আগত প্রথম বিদেশি ব্রিটিশ পর্যটক “রা্লফ ফিজ্” (Ralph Fitch) ১৫৮৬ খ্রিস্টাব্দে, চিলা রায়ের দুর্গের সুরক্ষিত গঠন প্রণালী দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন এবং স্হাপত্য ও নির্মাণ দেখে চিলারায়কে রাজা ভেবেছিলেন।

chilaray garh tufanganj
Dispossessed Chilaray Garh – Tufanganj

ঐতিহাসিক এডোয়ার্ড গেইট তার “History of Assam” গ্রন্থে রালফ ফিজের এই অঞ্চলে ভ্রমণবৃত্তান্তের কথা উল্লেখ করেছেন। তার ভ্রমণবিবরণী থেকে জানা যায়, দুর্গগুলি উঁচু মাটির প্রাচীরের উপর বাঁশ, বেত, কাঠ, খড় দিয়ে তৈরি। ঐতিহাসিক হরেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী তাঁর গ্রন্থ “CoochBehar state and land revenue settlement,,1903 এ উল্লেখ করেছেন চিলারায় তার দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন ইট দিয়ে। ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের ভয়াল ভূমিকম্পে দূর্গটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং মাটির গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। দুর্গের ভিতর অন্দরমহল ও ছিল। অন্দরান ফুলবাড়ির এই দুর্গটি চিলা রায়ের কোর্ট বা বড় কোর্ট নামে পরিচিত। এই চিলা রায়ের গড় থেকেই ৩ কিলোমিটার দক্ষিণ পূর্বে ফুলবাড়ী মৌজায় আরো একটি দুর্গ ছিল। ওই দুর্গটির নাম ছিল খামাড়বাড়ি। এর অবশিষ্ট বলে আর কিছু নেই। দুর্গ দুটির জমির পরিমাণ ছিল ৫৬ বিঘা এবং ১৫বিঘা। অসমীয়া বৈষ্ণব ধর্মগুরু শ্রীমন্ত শংকরদেব চিলা রায়ের বড় কোর্টে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং এই বড় কোর্টে চিলারায় বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন (অন্যমতে  জোড়াই রামপুরের জালধোয়া দুর্গে )।

ঐতিহাসিক স্মৃতি বহনকারী  প্রাচীন নগরী চিলা রায়ের গড়  জনবসতির/জনবিস্ফোরণের  ফলে সমৃদ্ধ ইতিহাসকে পদপিষ্ট  করেছে।এখানকার সমৃদ্ধ ইতিহাস না জানার ফলে বা আগ্রহ না থাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা ঐতিহাসিক উপাদানগুলি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সরকারি প্রচেষ্টাও খুব একটা লক্ষ্য করা যায় না। সাকুল্যে ৬/৭ বিঘা জমি অবশিষ্ট আছে। প্রাচীন এই মহাকুমার অন্যতম পুরাকীর্তির নিদর্শন বা পূরাসম্পদের স্মৃতিচিহ্ন আজ অস্তিত্ব সংকটের মুখে।শুভবুদ্ধি সম্পন্ন সুনাগরিকগণ, ইতিহাস প্রেমী মানুষ জন এবং সর্বোপরি সরকার এগিয়ে না এলে আগামীদিনে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

 ২) দি পল্লীভান্ডার লিমিটেড কোম্পানি / The Pallibhandar Limited Company

কুচবিহারের প্রজাবৎসল মহারাজ জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণের আনুগত্যে ও আন্তরিকতায় ১৯৪৮ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর  রাজসরকার কর্তৃক তুফানগঞ্জ শহরে ” দি পল্লীভান্ডার লিমিটেড কোম্পানি” স্থাপিত হয়। মূলত প্রজাদের ব্যবসার প্রতি আগ্রহ ও উৎসাহ দানের জন্য  শহরের প্রানকেন্দ্র কাছারি মোড়ের (মহকুমাশাসক এর করন) বিপরীতে পল্লী ভান্ডার কোম্পানীর নামে পৌনে দুই বিঘা জমি দান করেন মহারাজা । ৭জন ছিলেন বোর্ড অফ ডিরেক্টর এবং ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে মনোনীত হয়েছিলেন ডাঃ মতিয়ার রহমান ও শ্রীযোগেন্দ্রনাথ মন্ডল।যতীন্দ্রনাথ সিং সরকার পল্লীভান্ডারের প্রতিষ্ঠা এবং ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ব্যবসায়িক লক্ষ্যে এই কোম্পানি চালু হওয়ায়  গালামাল থেকে শুরু করে ধান, পাট, সরিষা, কাপড় ও ঔষধ ইত্যাদি দিয়ে  পল্লীভান্ডার কাজ শুরু করে। পল্লীভান্ডারের অধীনে এজেন্টরা জিনিসপত্র ক্রয় বিক্রয়ের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে বিরাট সারা ফেলে।

১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট দেশ স্বাধীন হয় এবং ১৯৪৯এর ১২ সেপ্টেম্বর ভারতের একটি “গ”  শ্রেণীর রাজ্য হিসেবে ঘোষিত হয় এবং ১৯৫০ সালের ১ লা জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের  একটি প্রান্তিক জেলায় পরিনত হয়। দেশ ভাগ ও কুচবিহার পশ্চিমবঙ্গের জেলা হওয়ায় পল্লী ভান্ডারের বেশির ভাগ মুসলিম এজেন্ট পূর্ব পাকিস্তানে পালিয়ে যায়। এমনকি পল্লী ভান্ডারের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডাঃ মতিয়ার রহমান ও পূর্ব পাকিস্তানে চলে যায়। এমতাবস্থায় পল্লী ভান্ডারের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়।পরবর্তীকালের ইতিহাস খুবই নিন্দনীয় ও দুঃখজনক। বর্তমানে পল্লীভান্ডারের ঘর,বাড়ি ও জায়গা জমি সব বেদখল হয়ে আছে।যুক্তফ্রন্ট সরকার পল্লীভান্ডারের জমিকে ভেস্ট করে দেয় ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে। দীর্ঘ আইনি লড়াই ও পরিশ্রম  চালিয়ে যাওয়ার পর পল্লীভান্ডার কোম্পানির অনুকূলে Court Judgement দেয়।

আইনি অধিকার পেলেও সবদিক থেকে বঞ্চিত ও নিপীড়িত হয়ে আছে পল্লীভান্ডার। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় বিশ্বাসী হয়েও নিজের অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া পল্লীভান্ডার কোম্পানি তার নিজের অধিকার ফিরে পেতে চায়। পল্লীভান্ডার এন্ড কোং দেশের আইন ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখে নিজের অধিকার ফিরে পাওয়ার আশায়।অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলেও আমরা আশাবাদী পল্লীভান্ডার তার অধিকার ফিরে পাবে। সুচিন্তিত নাগরিকগণ, শহরপ্রেমি সুধী নাগরিকবৃন্দ ও  তুফানগঞ্জ প্রেমী মানুষজনের আন্তরিকতায়  এই প্রথিতযশা কোম্পানি পুনরায় প্রজাবৎসল মহারাজ জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ন ভূপবাহাদুরের প্রজাকল্যাণের স্বার্থে  প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি ও কর্মকাণ্ডকে শ্রদ্ধা জানিয়ে পুনরায় তার অধিকার ফিরিয়ে দিবে। অধিকার অর্জন করা মৌলিক অধিকার এবং অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া নৈতিক দায়িত্ব।

৩) কুমার গজেন্দ্র নারায়ণ সাহেবের ইস্টেট / Kumar Gajendranarayan Estate

(খতিয়ান নং:-৬৭৫৮,দাগ নং:-২৫৩৮০,২৫৩৮১,২৫৩৮২)
রাজ্যে কুচবিহারের ১৬ নং মহারাজা হরেন্দ্র নারায়ণ ( রাজত্বকাল :- ১৭৮৩ – ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দ ) দ্বিতীয় পুত্র হলেন রাজকুমার মেঘেন্দ্র নারায়ণ ( জন্ম :- ১৭৯৬ খ্রিস্টাব্দ, মৃত্যু :- ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দ )। এই রাজকুমার মেঘেন্দ্র নারায়ণের তৃতীয় পুত্র কুমার লক্ষীন্দ্র নারায়ণের কনিষ্ঠ পুত্র হলেন কুমার গজেন্দ্র নারায়ণ জুনিয়র।কুমার গজেন্দ্র নারায়ণ তাঁর জ্ঞাতি আত্মীয় তথা তৎকালীন কুচবিহার রাজ্যের মহারাজ নৃপেন্দ্র নারায়ণ ভূপবাহাদুরের পরামর্শে ইংল্যান্ড  থেকে কৃষি ও উদ্ভিদ বিদ্যায় বিশেষ পাঠ নিয়ে দেশে ফিরে কুচবিহার রাজ্যের কৃষি ও বন বিভাগের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন। তাঁরই তত্ত্বাবধানে কুচবিহার রাজ্যে বিভিন্ন উদ্যান স্থাপিত হয়। এরপর তিনি রাজ্যের রাজ্যেপুলিশ বিভাগের সর্বোচ্চ পদে নিযুক্ত হন। তিনি রিজেন্সি কাউন্সিলের আমৃত্যু সদস্য ছিলেন।কুমার গজেন্দ্র নারায়ণ জুনিয়র মৃত্যুর এক বছর আগে তাঁর সম্পত্তির ৬ ই জুন ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে একটি উইল করেন। তিনি তৎকালীন মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণ ভূপবাহাদুরকে এই উইলের একজিকিউটার হিসাবে রাখেন।বর্তমান শহর কুচবিহারে উইলকৃত প্রচুর ভূ-সম্পত্তি (ছোট মদনমোহন বাড়ি,ভবানী বাজার সংলগ্ন এলাকায়  জায়গা) আছে।একইভাবে তার সম্পত্তির অনেকটা অংশ আছে তুফানগঞ্জ শহরে।

gajendranarayan estate tufanganj
Dispossessed Kumar Gajendranarayan Estate – Tufanganj
তুফানগঞ্জ নৃপেন্দ্র নারায়ণ মেমোরিয়াল হাই স্কুল (Tufanganj NNM High school) এর বিপরীতে ৩২ শতক জায়গা আছে। এই জায়গাটার জন্য  উইলে উল্লেখ আছে যে,

১) এই জায়গার আয়ের অংশ থেকে তার  উত্তরাধিকারীরা মাসোয়ারা (প্রত্যেক মাসে) পাবেন।
২) আয়ের কিছু অংশ নির্বাহ করতে করা হবে ছোট মদনমোহন বাড়ির নিত্য পূজা ও মন্দির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য। ৩) এই এলাকার মেধাবী ছাত্র ছাত্রীদের(মূলত রাজবংশী) জন্য বৃত্তি (scholarship ) দেওয়া হবে উক্ত জমির প্রাপ্ত লভ্যাংশ থেকে । ৪) এই জমি গুলি কোন ভাবেই বিক্রি করা যাবে না, যে বা যারা ব্যবসা করবে অবশ্যই তাকে লিজ নিয়ে করতে হবে। ৫) কোনরকম পাকা নির্মাণ, বিল্ডিং নির্মাণ, কংক্রিটের নির্মাণ করা যাবে না । ৬) আরো কিছু আছে ,,,,,,,ইত্যাদি । এই বিশাল ভূসম্পত্তি দেখার জন্য একজন প্রশাসক নিয়োগ করা হয় ।

তিনি ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ৮ ই নভেম্বর পরলোক গমন করলে তাঁর উইলের শর্ত অনুযায়ী রিজেন্সি কাউন্সিল সম্পত্তি পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন সিভিল জজ সাহেবের উপর। ভারত ভুক্তির পর এই দায়িত্ব পালন করে আসছেন জেলা জজ। প্রথম প্রশাসকের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল  ললিতমোহন বক্সী( B.L ) উপর। তিনি এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন আমৃত্যু ২৬/০২/১৯৬৫ পর্যন্ত।পদাধিকারবলে জেলা জজ এই সম্পত্তির প্রধান প্রশাসক।

উইলের শর্ত অনুযায়ী, এখানে কোনো কংক্রিটের নির্মান করা যায় না, সোজা কথায় বিল্ডিং তৈরি হয় না। ওই জমিতে আছে রাজ আমলের “ডাকঘরটি”। দুর্ভাগ্য আজ কুচবিহার জেলা হেরিটেজ জেলা , শতাধিক বছর পুরনো হেরিটেজ সম্পত্তি ডাকঘরটিও আজ বেদখল হয়ে আছে। এত কিছুর পরেও প্রশাসন বা প্রশাসকের সদর্থক ভূমিকা পাওয়া যায় না। কেন? কিসের স্বার্থ ? কার স্বার্থে ? কুচবিহারের ভারতভুক্তি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের ফলে এখানকার ভৌগলিক, অর্থনৈতিক পরিবর্তন হয়েছিল। স্থানীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজবংশী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কুচবিহারের প্রবেশ করা বিভিন্ন নরগোষ্ঠী ও মিশ্রিত নরগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক ধ্যান-ধারণা, পরিকাঠামো , ভাষা-সংস্কৃতির আদান-প্রদান, সমন্বয় ঘটতে থাকে।

এখানকার সাদাসিধা লোকজন সাদরে গ্রহণ করে এবং মানবিক মূল্যবোধের পরিচয় দেয়। কুচবিহারের মহারাজাদের   শিক্ষা তার প্রজাদের এই নৈতিকতা টুকু শিখিয়েছিল। কিন্তু এই মানবিকতার মূল্যবোধ কিছুসংখ্যক নোংরা, সার্থান্বেষী ব্যক্তির লালসার  জন্য আজ আর সেই জায়গাটা নেই। এই ভূখন্ডের অধীশ্বরদের জায়গা তারা দখল ধরে আছে। কত বড় স্পর্ধা, সাহস তাদের। ভাবতে অবাক লাগে মুষ্টিমেয় কিছু লোকের এই কুকর্মকে কেউ প্রতিবাদ করেনা। সারা জেলাজুড়ে মহারাজাদের জমি/সম্পত্তি (আস্তে আস্তে সবটাই তুলে ধরবো ) দখল নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যাইহোক , মূলত যে উদ্দেশ্যে এই জমিটি দান করা হয়েছিল বা জেলা ভূক্তির সময় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডঃ বিধান চন্দ্র রায় যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তার সবই গুড়ে বালি । রাজ ভাবাবেগকে বারবার আঘাত করা হচ্ছে, মহারাজা ও তার পরিবারের  দানকৃত এবং উইলকৃত সম্পদের উপর গুটিকয়েক লোকেদের গ্রাস করার মানসিকতা বরাবর লক্ষ করা গেছে। কতটুকু আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছে এই জায়গায়। গণতান্ত্রিক দেশে আইন তো সকলের জন্য সমান। তাহলে ওই জায়গায় অবৈধ নির্মাণ কি করে হলো? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশাসন জনগণের স্বার্থে সঠিক ভূমিকা পালন করবে এটাই কাম্য। শুধু মুখে বললেই হবে না administration  /government of the people ,for the people, by the people . আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

পরিশেষে, কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সম্প্রদায়কে আঘাত করার উদ্দেশ্য নয়। আমাদের কুচবিহারি সংস্কৃতি এটা আমাদের শেখায়নি। আমাদের অতিথিবৎসল আতিথিয়তা আমাদের দুর্বলতা নয়। মুষ্টিমেয় কিছু লোকের জন্য আমরা আমাদের সংস্কৃতি, একে অপরের ভাবের আদান-প্রদান নষ্ট করবোনা।ঠিক তেমনি মহারাজাদের সম্পদ দখলকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আওয়াজ তুলব। সর্বোপরি আমরা প্রশাসনের উপরে আস্থা রাখছি। লোকাল বডি, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসন, রাজ্য প্রশাসন আশা করি সদর্থক ভূমিকা নেবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published.